একসময় জ্বালানি তেলনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে পরিচিতি থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সে পরিচয় অনেকটাই পাল্টে ফেলেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো। বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো প্রধান আঞ্চলিক অর্থনীতিতে জ্বালানি তেল-বহির্ভূত খাতের অবদান বেড়ে চলেছে। অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ প্রচেষ্টা ও জ্বালানি তেলবহির্ভূত খাতের দৃঢ় সম্প্রসারণে ‘ভিশন ২০৩০’ নামের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে আসছে রিয়াদ। ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংকের (এফএবি) সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে ধারাবাহিক সে লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূরণ প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রস্তুত দেশটি। খবর আরব নিউজ।
এফএবির বিশ্লেষণ রিয়াদ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেখানে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সৌদি অর্থনীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়তে পারে। আরব আমিরাতের অন্যতম ব্যাংকটি বলছে, আমাদের গঠনমূলক পূর্বাভাস গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) অঞ্চলের সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে আরো সুসংহত হয়েছে। মুডি’সে সৌদি আরবের ঋণমানের ঊর্ধ্বগতির মাধ্যমে তা নিশ্চিত হয়েছে। সৌদি আরবের বৈচিত্র্যকরণ গতি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে বৈশ্বিক ঋণমান সংস্থা মুডি’স সৌদি আরবের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর রেটিং এ১ থেকে এএ৩-এ উন্নীত করেছে, যা স্থিতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
মুডি’সের ঋণমান সূচক অনুসারে, উচ্চমানের এএ৩ রেটিং নিম্ন ঋণ ঝুঁকি এবং স্বল্পমেয়াদে ঋণ পরিশোধের শক্তিশালী সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। সংস্থাটি জানিয়েছে, রেটিংয়ের এ ঊর্ধ্বগতি সৌদি আরবে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের সাফল্য এবং জ্বালানি তেলের ওঠানামা ও দীর্ঘমেয়াদে কার্বনভিত্তিক জ্বালানি রূপান্তরের চ্যালেঞ্জের প্রভাব কমার প্রতিফলন।
এফএবির প্রতিবেদন অনুসারে, জিসিসি অঞ্চলের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৪ সালের ২ দশমিক ১ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ হয়ে চলতি বছরে ৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছবে। এ পূর্বাভাসে চালকের আসনে রয়েছে দেশগুলোয় জ্বালানি তেল-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বৃদ্ধি।
এফএবির গ্লোবাল প্রাইভেট ব্যাংকিং গ্রুপ প্রধান মিশেল লংঘিনি বলেন, ‘২০২৫ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশে স্বতন্ত্র কিছু চ্যালেঞ্জ থাকবে। তবে জিসিসি অঞ্চল স্থিতিশীলতা ও ব্যবসায়িক সুযোগের বাতিঘর হিসেবে উজ্জ্বল থাকবে।’
জিসিসি অঞ্চলের জ্বালানি তেল-বহির্ভূত ব্যবসায় ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২০ সালের শেষ থেকে বেশির ভাগ দেশের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) ৫০-এর ওপরে রয়েছে, যা সম্প্রসারণের সংকেত দেয়। ফেব্রুয়ারির শুরুতে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল জানিয়েছে, জানুয়ারিতে সৌদি আরবের পিএমআই ছিল ৬০ দশমিক ৫, যা ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ইউএই, কুয়েত, কাতার ও মিসরের পিএমআই ছিল যথাক্রমে ৫৫, ৫৩ দশমিক ৪, ৫০ দশমিক ২ ও ৫০ দশমিক ৭।
এফএবি বলছে, ‘এ সূচকগুলো অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম, ভোক্তাব্যয় ও বেসরকারি বিনিয়োগের দৃঢ়তার প্রতিফলন, যা জিসিসি অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের সাফল্যও তুলে ধরে। এখানে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পর্যটন, অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো খাত।’
এ অঞ্চলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ভিশন ২০৩১’ ও সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর মতো জাতীয় উদ্যোগগুলো প্রযুক্তি, স্টার্টআপ এবং সামগ্রিক জ্বালানি তেলবহির্ভূত খাতের প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করছে। এফএবির পূর্বাভাসে আরো বলা হচ্ছে, জিসিসি ইকুইটি মার্কেটগুলো ২০২৫ সালে ১২-১৩ শতাংশ রিটার্ন দিতে পারে। এতে অবদান রাখতে পারে মূল খাতগুলোর পুনরুদ্ধার ও আর্থিক স্থিতিশীলতা।
প্রতিবেদনে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোও তুলে ধরা হয়েছে। এফএবির মতে, এ অঞ্চলের ডিজিটাল রূপান্তর দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডাটা ও সাইবার নিরাপত্তার মতো উদ্ভাবনী প্রযুক্তির জন্য প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে।
সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নও এ অঞ্চলে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া সৌরশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সৌদি ও আরব আমিরাতসহ অন্যান্য দেশ উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করছে।
আবাসন, পর্যটন ও অবসর বিনোদনে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করেছে সৌদি আরব। নিওম, এক্সপো ২০৩০ ও ফিফা বিশ্বকাপ ২০৩৪-এর মতো উদ্যোগ দেশটির পর্যটন খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। সম্প্রতি দুই পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার রিয়েল এস্টেটে বিদেশী মালিকানা উন্মুক্ত করেছে সৌদি ক্যাপিটাল মার্কেট অথরিটি, যা দেশটির ব্যবসায়িক খাতে বড় ধরনের সম্প্রসারণের প্রতিফলন।