অর্থনীতি ডেস্ক | রবিবার, ২০ আগস্ট ২০২৩ | প্রিন্ট | 79 বার পঠিত
সংগৃহীত ছবি
এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশিদ । তিনি ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি)-এর সভাপতি। সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যবসা-বাণিজ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম
ব্যবসায়ীরা নানা চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন। আপনার মূল্যায়ন কী?
হুমায়ুন রশিদ: স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দেশ আজকের অবস্থানে এসেছে। স্বাধীনতার প্রথম দশকে বার্ষিক মোট রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ৭০ কোটি ডলার। এখন তা সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ডলারের বেশি। শুরুতে পাট ও চা থেকে বেশি আয় আসত। এখন গার্মেন্টস পণ্য থেকে। এই রূপান্তর হঠাৎ করে হয়নি। এর মধ্যে নানা চ্যালেঞ্জ ছিল। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, দুর্নীতি, বিনিয়োগে বিরূপ পরিস্থিতি– এমন বহু সংকট কাটিয়ে এগিয়ে চলছি আমরা। শুরুর তুলনায় এসব দুর্বলতা অনেকটা কমেছে। কোনো ক্ষেত্রে সরকারি নীতিসহায়তা ছিল, কোনো ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ছিল না। তার জন্য কিছু আটকে থাকেনি। ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ সকলে অদম্য কর্মস্পৃহা এগিয়ে নিয়ে কাজ করছেন।
বর্তমানের কোন চ্যালেঞ্জটি বেশি ভাবাচ্ছে?
হুমায়ুন রশিদ: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের জন্য এটা দরকার। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক বেশ সংকটে পড়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপ-আমেরিকায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাব এ খাতে আছে। বিশেষত গত ছয় মাসে এ খাতে বড় অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। কখনও রপ্তানি বাড়ছে, কখনও কমছে। এর মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা, বিশেষত দর নিয়ে নতুন উৎকণ্ঠা আছে। ধারণা করা হচ্ছে, শ্রমিক খরচও বাড়বে। এতে এ খাত যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।
এ চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব?
হুমায়ুন রশিদ: রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণ এর বড় সমাধান। আমাদের এখানে প্রকৌশল খাতের শিল্প গড়ার ব্যাপক সম্ভাবনা ছিল। বিশ্বের এর বড় বাজার আছে। এদিকে কারও মনোযোগ নেই। তাছাড়া আমাদের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় খাত হলো জনশক্তি। আগামী আরও দুই থেকে তিন দশক দেশের জনসংখ্যায় কর্মক্ষম যুব শক্তির আধিক্য থাকবে। এই জনশক্তিকে যথাযথ কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগাতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের খাত আরও বড় হতো।
সরকার তো চেষ্টা করছে। জেলা থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত যুব প্রশিক্ষণ একাডেমি করেছে।
হুমায়ুন রশিদ: এটা ঠিক, অনেক যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হয়েছে। আমরা আন্তর্জাতিক বাজার চাহিদা জেনে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি? আমাদের জনশক্তি রপ্তানির কতটুকু প্রশিক্ষিত? ভারত, পাকিস্তানের লোকেরা যে কাজ করে না, আমরা সেই কাজে লোক পাঠাচ্ছি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রথাগত। এখানে বিবিএ, এমবিএ পাস ছেলেমেয়ের অভাব নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকরা বর্তমানে দেশের এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কোন ধরনের জনশক্তি ও কর্মদক্ষতা দরকার, তা ভাবছেন বলে মনে হয় না। ফলে বড় প্রকল্প ও শিল্পে বিদেশিদের ভাড়া করে আনতে হচ্ছে। এ দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বয়স চার দশকের। এখনও ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার লোকেরা বড় পদে কাজ করছেন। এখনও তাদের বিকল্প তৈরি করতে পারছি না। যুগের চাহিদার সঙ্গে আমরা নেই। আমাদের যুগের চাহিদায় দক্ষ ও উদ্ভাবনে সক্ষম জনশক্তির অভাব আছে।
বর্তমান সরকার চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী জনশক্তি তৈরির জন্য কাজ করছে। এরপরও সংকট কােথায়?
হুমায়ুন রশিদ: দেখুন, জাতি হিসেবে আমরা অত বুদ্ধিমান নই। এক বা দুইজনকে দিয়ে পুরো দেশ চিন্তা করলে হবে না। আমরা কম্পিউটার ব্যবহার করছি বলে কম্পিউটার অপারেটর বানাচ্ছি। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করছি না। আমি মনে করি, আইটি খাতের তুলনায় উৎপাদনমুখী খাতে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আমাদের উপযোগী কর্মসংস্থান তৈরি করা উচিত। যেমন- ভারত ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ। এর অর্ধেকই নারী। আমরা এ বাজারটিকে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক স্বল্পমূল্যের শাড়ি উৎপাদন করতে পারতাম। আমাদের মধ্যে এই উদ্ভাবন ও নতুন চিন্তা নিয়ে কাজ করার মানসিকতা নেই। শিক্ষা ব্যবস্থা ও দক্ষ জনশক্তির অভাব আমাদের প্রধান বাধা। বাধা দূর করতে পারলে দেশে-বিদেশে প্রচুর কর্মসংস্থান হতো। দেশে শিল্পায়ন বাড়ত। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ত এবং এক খাত নির্ভরতার কারণে মাঝেমধ্যেই যে অস্থিরতার মধ্যে পড়ছি, তা কমে যেত। যার কিছুই হচ্ছে না।
এ দায় কার?
হুমায়ুন রশিদ: প্রথমত নীতিনির্ধারকদের। দ্বিতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর। চাইলে তারা শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে একটি মেলবন্ধন তৈরি করতে পারেন। কিন্তু হচ্ছে না। বছর বছর লাখ লাখ ছাত্রছাত্রী অনার্স-মাস্টার্স পাস করে বের হচ্ছে, কিন্তু চাকরি পাচ্ছে না। চাকরির বাজার অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করায় মনোযোগী হওয়া উচিত।
প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ অনেক কম। এর কারণ কী?
হুমায়ুন রশিদ: বিনিয়োগের জন্য ভালো পরিবেশ দরকার। এর অভাব আছে। শিল্প গড়তে যে দক্ষ জনশক্তি দরকার, তা যদি এখানে না পাওয়া যায়, তাহলে কেন এখানে এমন শিল্প কারখানা করবে। প্রতিযোগী অনেক দেশ এজন্য কাজ করছে, প্রশিক্ষিত জনশক্তি নিশ্চিত করছে। অনেক দেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিনামূল্যে জমি দিচ্ছে। দ্রুত ইউটিলিটি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের জোগান নিশ্চিত করছে। কর ছাড়ও দিচ্ছে। এখানে বিনিয়োগ করতে এলে পদে পদে বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাছাড়া দুর্নীতি সর্বত্র। এগুলো দূর করা না গেলে সামনে চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে।
Posted ৩:০১ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২০ আগস্ট ২০২৩
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam