শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুপারশপের প্রসার, পরিধি বাড়াতে হবে: সাব্বির নাসির

শিল্প ও বাণিজ্য ডেস্ক   |   শুক্রবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৩   |   প্রিন্ট   |   69 বার পঠিত

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুপারশপের প্রসার, পরিধি বাড়াতে হবে: সাব্বির নাসির

সংগৃহীত ছবি

মধ্য কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা এখন নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম বা উচ্চমূল্যস্ফীতি। কেন দফায় দফায় দাম বাড়ছে তা নিয়ে যখন সবাই উদ্বিগ্ন, তখন দেশের বৃহৎ চেইন সুপারশপ ‘স্বপ্ন’র প্রধান নির্বাহী সাব্বির হাসান নাসির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, কৃষক, উৎপাদক, আমদানিকারক থেকে শুরু করে খুচরা দোকান পর্যন্ত সর্বত্রই সমন্বিত নীতিমালার অভাব। তিনি আরও বলেন, জবাবদিহি বাড়াতে হলে পুরো প্রক্রিয়াকে উন্নত বিশ্বের আদলে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। এ জন্য দেশের সুপারশপগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার সুলতান আহমেদ ।

বাংলাদেশের মতো কম আয়ের দেশে সুপারশপের ভবিষ্যৎ কী?

সাব্বির হাসান নাসির : বাংলাদেশে সুপারশপের ব্যবসা ‘আগোরা’র হাত দিয়ে শুরু হয়। শুরুতে খুব এলিট ক্লাসের গ্রাহকরা শুধু এখানে কেনাকাটা করতে আসতেন । ঢাকার অভিজাত এলাকায় ছিল তাঁদের আউটলেট । এরপর ‘স্বপ্ন’সহ অন্যান্য কিছু ব্র্যান্ড ‘সুপারশপ ফর অল’ এ ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করে। ২০১২ সালের দিকে এটা বিস্তৃত হতে শুরু করে, তখনো পুরো মার্কেটের শূন্য দশমিক তিন শতাংশ ছিল সুপারশপের দখলে, যা এখন ২ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ পুরো মার্কেটে যত বেচা-বিক্রি হয়, তার মাত্র ২ শতাংশ এখন সুপারশপের হাতে। অন্যান্য দেশের কথা যদি বলি, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এর মার্কেট শেয়ার ৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৪৩ শতাংশ, ফাস্ট ওয়ার্ল্ডে ৬০/৭০ শতাংশ, কোথাও কোথাও ৮০/৯০ শতাংশ। উন্নত বিশ্বে এত বেশি হওয়ার পেছনে একটা কারণ মাথাপিছু আয়। মাথাপিছু আয় যত বাড়ে সুপারশপের পরিধি তত বাড়ে। কারণ গ্রাহকের কাছে তখন স্বাস্থ্য সচেতনতা, বাজারের পরিবেশ ও সময়ের দাম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে সরকারের স্বদিচ্ছা। সরকার যদি আসলেই চায় মডার্ন ট্রেড গড়ে তুলতে, যেখানে জবাবদিহি থাকবে, তাহলে সেখানে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে ব্যাংক, প্রাইভেট ইক্যুইটি ও প্রাইভেট সেক্টরের অংশগ্রহণ। অর্থাৎ বড় বিনিয়োগকারীদের এ খাতে এগিয়ে আসা। আমাদের দেশে মাথাপিছু আয় বাড়ছে, এখন প্রশ্ন আসবে সরকার সত্যিকার অর্থেই চায় কি না মডার্ন ট্রেডের বিকাশ হোক। আমরা যদি মাথাপিছু আয় ভারতের সঙ্গে তুলনা করি তাহলে আমাদের বাজারের অন্তত ৫/৬ শতাংশ শেয়ার থাকার কথা ছিল সুপারশপের দখলে। এখানেই প্রশ্ন আসে, সরকার কি সত্যিকার অর্থেই চায় এই সেক্টরের উন্নয়ন করতে? আমার কাছে মনে হয় না তারা সেটা চায় ।

কেন আপনার মনে হচ্ছে সরকার চায় না?

সাব্বির হাসান নাসির: কারণটা খুব পরিষ্কার। যদি তারা সত্যিকার অর্থেই চাইত তাহলে শুধু সুপারশপের ওপর ৫% হারে ভ্যাটের ব্যারিয়ার দিয়ে রাখত না। বাইরে থেকে কিছু কিনলে আপনার কোনো ভ্যাট নেই অথচ সুপারশপ থেকে নিলে ৫ শতাংশ ভ্যাট। আমাদের এই ৫% ভ্যাট অনেক ক্ষেত্রেই ডিসকাউন্ট দিতে হয়, যা প্রফিট মার্জিনকে অনেক নাজুক করে দেয়। যদি সরকার চাইত তাহলে আমাদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করত, এভাবে বৈষম্য করত না। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কেন সরকার এটা করছে না? সে প্রশ্নের উত্তরে আমার কাছে যেটা মনে হয়, তা হচ্ছে সরকার একপ্রকার ভয় পায় যে, ইনফরমাল বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সুপারশপের প্রসার বাড়লে সেটা না উচ্ছেদ হয়ে যায়। সেখানে যে প্রচুর কর্মসংস্থান হয়েছে, তা বন্ধ হয়ে যায় কি না। আবার সরকার এটাও ভাবতে পারে যে, সুপারশপ তো বড়লোকদের বাজার, এখানে যাঁরা বাজার করেন ৫ শতাংশ ভ্যাট তাদের কাছে কোনো বিষয়ই না। সুপারশপ এখন আর সাধারণের বিলাসিতা নয়। একটা নারীর নিরাপদ বাজার, মধ্যবিত্তের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সম্ভার। আমি মনে করি, সরকারের এখন ভাবা উচিত ১৮ বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রিতে জবাবদিহি আনা গেলে মূল্যস্ফীতি সহজেই কন্ট্রোল করা সম্ভব। এ ছাড়া, ফুড সেফটি নিশ্চিত করতে চাইলে সুপারশপের বিকল্প নেই। খোলাবাজারে আপনি সহজে কাউকে ধরতে পারছেন না, এখানে তো চার-পাঁচজন রিটেইল কোম্পানিকে জবাবদিহিতায় আনতে পারছেন। আবার যদি ভ্যালু চেইনের স্বচ্ছতার প্রশ্ন আসে, তাহলে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করা পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অনেক বেশি সহজ। পুরো পৃথিবীতে এ কারণেই সুপারশপ ব্যবস্থা এত জনপ্রিয়। শুধু তাই নয়, এটা একধরনের সভ্যতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকও। তবে আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা সেখানে যেতে পারছি না। বড় কোম্পানিগুলোকে দেখুন তারাও খুব বেশি আসছে না এখানে বিনিয়োগ করতে। তারা ভাবছে এখানে লাভ করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। আবার ব্যাংকগুলোও অনেক ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাচ্ছে না এ খাতে ঋণ দিতে।

অনেক গ্রাহকের এমনকি ভোক্তা অধিদপ্তরেরও অভিযোগ রয়েছে সুপারশপে দাম বেশি। আপনি বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে পারে সুপারস্টোর, কীভাবে?

সাব্বির হাসান নাসির: এটা ওনাদের ভুল ধারণা। আমি বলব প্রাইসিং কীভাবে হয়, কীভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ে তা না জেনেই এমন অভিযোগ করা হয়েছে। মনে করেন, পেঁয়াজ কিংবা আলু যা নিয়ে এখন খুব আলোচনা হচ্ছে। আমরা কখনই পাইনি এসব চাষ করে কৃষক খুব লাভ করেছে। আবার যারা খুচরা ব্যবসা করছে তারাও এটা করে বাড়ি-গাড়ি করছে তাও নয়। তাহলে বাড়তি দাম যাচ্ছে কোথায়? রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নে প্রভাব ফেলেছে বাংলাদেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে। বাজারে আমাদের শেয়ার মাত্র ২ শতাংশ, তাহলে আমরা কীভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারি? সরকারের উচিত ভ্যালু চেইনের সব স্টেকহোল্ডারদের তথ্য নিয়ে, ডেটা নিয়ে কাজ করে সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করা।

আপনি বলছিলেন মূল্যস্ফীতি কমানোর কথাও- সেটা কীভাবে?

সাব্বির হাসান নাসির: আপনি দেখবেন আমরা প্রচুর মূল্যছাড় দিই। আমরা যেহেতু একটা বড় অ্যামাউন্ট একসঙ্গে কিনি তাই কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আমরা বার্গেনিং করে কিছুটা কমে কিনতে পারি। আমাদের মডার্ন ট্রেডের শেয়ার এখনো অনেক কম। এই সীমিত শেয়ার নিয়েও আমরা যেসব ছাড় দিচ্ছি, তা অনেক পণ্যের ক্ষেত্রেই বাজার থেকে অনেক অনেক কম। আমাদের শেয়ার আরও বাড়লে বাজার ব্যবস্থার ওপর আমাদের ও সরকারের নিয়ন্ত্রণ সহজ হতো।

গ্রাহকদের অভিযোগ রয়েছে, সুপারশপে ফ্রেশ পণ্য পাওয়া যায় না। সেটা কেন?

সাব্বির হাসান নাসির: আমাদের অধিকাংশ কৃষিপণ্য আমরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকেই কিনে থাকি। তবে আমরা ফ্রেশ রাখার জন্য কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করি না। এ জন্য বাজারের মতো হয়তো ফ্রেশ মনে হয় না। এ ছাড়া মাংসের মধ্যে দেখবেন আমরা কোনো ওয়াটারিং করি না, যেটা বাজারে পাবেন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করি ফ্রেশ রাখার জন্য।

আপনি ভ্যাট বৈষম্যের কথা বলছিলেন, এখনো ইসিআর মেশিন সব ব্যবসায়ীকে দেয়া সম্ভব হয়নি। তাহলে ভ্যাটের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা কীভাবে আসবে?

সাব্বির হাসান নাসির: দেখুন ইসিআর মেশিন প্রজেক্ট বহু আগে থেকেই শুরু হয়েছে। এনবিআর চেষ্টা করে যাচ্ছে সব ব্যবসায়ীর কাছে এটা পৌঁছে দিতে। সত্যি বলতে এ কাজটা সহজ নয়, বেশ কঠিন। আমি বহু আগেই বলেছিলাম এত ঝামেলা না করে উৎপাদন পর্যায়ে সরাসরি ৫% ভ্যাট বসিয়ে দিতে। কিন্তু এনবিআর তা করেনি। এটা করতে পারলে ভ্যাট আদায় নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকত না। আদায় কয়েকশ গুণ বেড়ে যেত, স্বচ্ছতাও নিশ্চিত হতো। ইন্ডিয়াতে এ ব্যবস্থা জিএসটিতে রয়েছে।

স্বপ্নের সফলতা আসে আপনার হাত ধরে, গ্রাহকদের উদ্দেশে কী বলবেন?

সাব্বির হাসান নাসির: আমরা স্বপ্ন করেছি মূলত মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের কথা মাথায় রেখে। আমরা এটা অনুভব করি মধ্যবিত্ত মানুষ এখন বেশ কষ্টে রয়েছে। তাদের কষ্ট কীভাবে লাঘব করা যায়, সেটা সবসময় আমাদের ভাবনায় থাকে। আমরা গ্রাহকদের সেন্টিমেন্ট বোঝার চেষ্টা করি, তারা কী ধরনের পণ্য কিংবা অফার প্রত্যাশা করেন, তা নিয়ে ভাবি। এ জন্য দেখবেন স্বপ্নের ডিসকাউন্ট অফার সবচেয়ে বেশি। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, আমাদের মতো কম দামে আপনি খোলাবাজারে অনেক পণ্য পাবেন না। শুধু তাই না, আমরা প্রতিটি কাস্টমারের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমরা পণ্যের কোয়ালিটি নিয়ে বিন্দুমাত্র কম্প্রোমাইজ করি না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে স্বপ্ন। তাই বলব, স্বপ্নের সঙ্গে থাকুন। এটা আপনাদের প্রতিষ্ঠান। নিজেদের ভেবে স্বপ্নে কেনাকাটা করুন, পরামর্শ দিয়ে স্টোর ম্যানেজমেন্টকে আরও গ্রাহকমুখী ও নির্ভুল করতে সাহায্য করুন। স্বপ্ন নিয়ে বাঁচুন।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১:৪০ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৩

bankbimarkhobor.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

[abm_bangladesh_map]
advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক
মোঃ ইসলাম শেখ
কার্যালয়

৭৯, সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড, (৩য় তলা, বাম দিক), সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭

01760742336

bankbimarkhobor@gmail.com