| সোমবার, ২৬ মে ২০২৫ | প্রিন্ট | 100 বার পঠিত
রুশ অর্থোডক্স চার্চে ‘আদর্শ পুরুষত্ব’ খুঁজছেন আমেরিকানরা
‘অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে: ফাদার মোজেস, কীভাবে আমি আমার পুরুষত্বকে অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়াতে পারি?’—এমন প্রশ্ন শুনেই শুরু হয় টেক্সাসের রুশ অর্থোডক্স চার্চের পুরোহিত ফাদার মোজেস ম্যাকফারসনের এক ইউটিউব ভিডিও। এই ব্যায়ামপাগল, ভারোত্তোলক, পাঁচ সন্তানের পিতা ফাদার মোজেস খোলাখুলি ঘোষণা করেন— দৃষ্টিনন্দন ভ্রু, স্কিনি জিন্স, পা গুটিয়ে বসা, ইস্ত্রি করা, এমনকি স্যুপ খাওয়াও ‘নারীবাচক’ আচরণ। তার মতে, প্রকৃত পুরুষত্ব মানেই নির্দ্বিধায় কর্তৃত্ব করা, পরিবারপ্রধান হওয়া এবং সন্তান উৎপাদনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা।
জর্জটাউন, টেক্সাসে অবস্থিত রাশানা অর্থোডক্স চার্চ আউটসাইড রাশিয়ার (আরওসিওআর) অধীন মাদার অব গড চার্চে গত ছয় মাসেই তিনি ৭৫ জন নতুন অনুসারীকে নিজের দীক্ষায় দীক্ষিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘২০ বছর আগে যখন আমরা অর্থোডক্সিতে রূপান্তরিত হই তখন এটাকে গোপন মনে হতো। এখন আমাদের সংখ্যা তিনগুণ হয়ে গেছে।‘
রোববারের উপাসনায় দেখা যায়, বিশ-বত্রিশ বছর বয়সী পুরুষেরা নীরব প্রার্থনায় মগ্ন। এদের মধ্যে অনেকেই আধুনিক আমেরিকান জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছেন না। এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বলেন, ‘আমার সুন্দর চাকরি, আদরের স্ত্রী ছিল। তবু মনে হতো ভেতরে একটা শূন্যতা আছে। পুরুষদের সমাজ খুব কঠিন চোখে দেখে, যেন সব দোষ আমাদের।‘
তাদের অনেকেই সন্তানদের বাসায়ই পড়াশোনা করাচ্ছেন, কারণ তারা বিশ্বাস করেন নারীদের ক্যারিয়ারের চেয়ে পরিবারকেই গুরুত্ব দেয়া উচিত। ফাদার জন হোয়াইটফোর্ড বলেন, ‘স্কুলগুলোতে জেন্ডার নিয়ে যা পড়ানো হয় তা থেকে সন্তানদের রক্ষা করার জন্যই বাসায় পড়ানো জরুরি।‘
অর্থোডক্স ধর্মাবলম্বী আমেরিকানদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, মাত্র ১%। কিন্তু করোনার পর থেকে নতুন অনুসারীদের সংখ্যা বাড়ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, ২০০৭ সালে যেখানে পুরুষ খ্রিষ্টানদের ৪৬% ছিল অর্থোডক্স, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪%-এ।
একটি জরিপে দেখা যায়, নতুন রূপান্তরকারীদের বেশিরভাগই পুরুষ এবং অনেকেই মহামারিকালীন এই ধর্মে প্রবেশ করেন। অনলাইন জগতেও এই ঢেউ স্পষ্ট— ফাদার মোজেস ইনস্টাগ্রামে তার স্ত্রীর গর্ভবতী হওয়ার একটি পজিটিভ টেস্টের ছবি ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেন। তার ছয় নম্বর সন্তানের আগমনের ঘোষণায় সেই পোস্টে ৬,০০০টি লাইক পড়ে।
ফাদার মোজেস ও তার অনুগতরা মনে করেন, অর্থোডক্স ধর্ম পুরুষালি নয়, বরং স্বাভাবিক এবং পশ্চিমা সমাজই অতি-নারীবাদে আক্রান্ত। তিনি বলেন, ‘আমি এমন কিছুতে অংশ নিতে চাই না, যা টেইলর সুইফট কনসার্টের মতো লাগে।‘
অন্যদিকে, রুশ চার্চের প্রধান প্যাট্রিয়ার্ক কিরিল ইউক্রেন যুদ্ধকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়েছেন। অনেকেই তাকে উস্কানিদাতা মনে করলেও আরেক অর্থোডক্স ফাদার হোয়াইটফোর্ড বলেন, কিরিলের বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বেশ কিছু আমেরিকান তরুণ এখন রুশ অর্থোডক্স চার্চের দিকে ঝুঁকছেন। আধুনিক আমেরিকান সমাজে নিজেদের মূল্যবোধ ও পরিচয় হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা থেকেই অনেকে এই ধর্মে দীক্ষা নিচ্ছেন। তাদের অনেকেই মনে করেন, সমাজে পুরুষদের ভূমিকা আজ প্রশ্নবিদ্ধ এবং ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় জীবনই এই সংকট থেকে মুক্তির পথ।
টেক্সাসে ফাদার মোজেসের মতো রুশ অর্থোডক্স পুরোহিতদের চার্চে তরুণ ধর্মান্তরিতদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। তাদের অনেকেই আগের ধর্ম ত্যাগ করে এই ধর্মগ্রহণ করছেন, ঘরোয়া জীবনধারা ও রক্ষণশীল পারিবারিক আদর্শে ফিরে যেতে চাচ্ছেন। প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণার ফলে এই চলমান ঢেউ হচ্ছে আরো বিস্তৃত।
এদিকে, রাশিয়ার প্রতি আকর্ষণে ফাদার জোসেফ গ্লিসনের মতো অনেক রক্ষণশীল মার্কিন পরিবারসহ রাশিয়ায় স্থায়ী হচ্ছেন। ক্রেমলিন এমন রক্ষণশীল অভিবাসীদের জন্য এখন ‘ভ্যালুজ ভিসা’ চালু করেছে।
অগ্নিনির্বাপণকর্মী ও পডকাস্টার বাক জনসনের মতে, ‘আমরা তাৎক্ষণিক ভোগবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি। পরিবার, সম্প্রদায়, ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।‘ তার মতো অনেকের কাছে রুশ অর্থোডক্স ধর্ম হয়ে উঠেছে আত্মপরিচয়ের নতুন ঠিকানা।
তবে এই ধারণার ব্যাপারে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে সানডে স্কুলের শিক্ষিকা এলিসা বিয়েলটিচ ডেভিস বলেন, ‘তাদের আচরণ অনেকটাই সামরিক ঘরানার, কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ, পুরুষতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী। যেন পুরনো আমেরিকান পিউরিটানদের সেই উন্মাদনা আবার ফিরে এসেছে।’
Posted ৪:১৪ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২৬ মে ২০২৫
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam