করদাতারাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রকৃত গ্রাহক বলে মন্তব্য করেছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, করদাতারাই অর্থনীতিকে সচল রাখেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন এবং সরকারের উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই করদাতাদের মতামত উপেক্ষা করে বিশেষজ্ঞ ও আমলাদের প্রস্তাব অনুযায়ী করহার বাড়ানো হলে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে—বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে।
আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইআরএফ-এর যৌথ আয়োজনে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এসব উদ্বেগ ও মতামত উঠে আসে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি. রহমান।
সেমিনারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তৈরি নীতিমালা অনেক সময় মাঠ পর্যায়ের বাস্তব ব্যবসায়িক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। তাই নীতি প্রণয়নের আগে বাস্তবতা বোঝা জরুরি।
তিনি কর প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী ও রাজস্ব সংগ্রহ কার্যক্রম পৃথক করার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমের অংশগ্রহণে একটি স্থায়ী উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যা নিয়মিতভাবে নীতি পর্যালোচনা করবে। একই সঙ্গে বাজেট প্রক্রিয়া আরও আগেই সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, অতিরিক্ত করহার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করে। সরকারের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশে কার্যকর করহার অনেক বেশি হওয়ায় তা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। এজন্য তিনি সম্পূর্ণ অটোমেটেড কর ব্যবস্থার ওপর জোর দেন, যাতে হয়রানি কমে আসে।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা সরকারের রাজস্ব কৌশলের সমালোচনা করে বলেন, কর বৃদ্ধি করে রাজস্ব বাড়ানোর প্রচলিত ধারণা কার্যকর নয়। এতে পণ্যের দাম বাড়ে, ভোগ কমে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের মতে, করদাতারা আসলে এনবিআরের গ্রাহক হলেও তাদের সমস্যাগুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
এমসিসিআইর ট্যাক্স ও ট্যারিফ কমিটির চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ বলেন, বাজেটের মূল দর্শন হওয়া উচিত করদাতাদের অংশীদার হিসেবে দেখা, শাস্তির দৃষ্টিভঙ্গি নয়। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপরই করের বোঝা বেশি পড়ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, বাজেট নিয়ে আলোচনা হলেও অনেক সময় তা বাস্তবায়নে প্রতিফলিত হয় না। পাশাপাশি এনবিআরে কর্মকর্তা পরিবর্তনের কারণে নীতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বক্তারা সরকারের বিভিন্ন নীতির মধ্যে অসামঞ্জস্যের উদাহরণ তুলে ধরেন। যেমন—নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসাহিত করার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ সংক্রান্ত উপকরণে উচ্চ কর আরোপ, যা বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে বলে তারা দাবি করেন।
তাদের মতে, আস্থা সংকট দূর না করে এবং কর ব্যবস্থাকে আরও ব্যবসাবান্ধব না করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য কর কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এমসিসিআই তাদের বাজেট প্রস্তাবে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২০ শতাংশ এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য ২৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি করমুক্ত আয়ের সীমা পাঁচ লাখ টাকা করার দাবি জানানো হয়। সংগঠনটি উৎসে কর কর্তন কমানো এবং রপ্তানি খাতে করহার হ্রাসেরও প্রস্তাব দিয়েছে।