শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

ঈদ অর্থনীতি : জনজীবনে সাময়িক স্বস্তি

  |   মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   27 বার পঠিত

ঈদ অর্থনীতি : জনজীবনে সাময়িক স্বস্তি

ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে নানামুখী বাড়তি কেনাবেচায় ভঙ্গুর অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। মুসলমানদের দ্বিতীয় এই ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের অধিকাংশ মানুষের আয়-ব্যয় নির্ধারিত সময়ের জন্য বেড়ে যায়। এতে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ে। এর ফলে নানামুখী চাপে থাকা হাঁসফাঁস অর্থনীতি স্বস্তির নিশ্বাস নিতে কিছু সময়ের জন্য একধরনের এক্সিট পায়। তবে এই স্বস্তির ধারা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী সপ্তাহে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। তাই অর্থনীতির অস্বস্তি কাটাতে সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে ঈদ অর্থনীতির সুফল কীভাবে সারা বছর ধরে রাখা যায়, সে বিষয়ে সমস্যা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এছাড়া কুরবানির সময় পশুর চামড়া কেনাবেচা নিয়ে সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে সরকারকে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। যুগান্তরের কাছে এমনটিই জানিয়েছেন কয়েকজন অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টরা।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, কুরবানির ঈদে বাড়তি টাকার প্রবাহ আসে মূলত তিন খাত থেকে। এর মধ্যে রয়েছে-সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের ঈদ বোনাস, রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) এবং ঈদ সামনে রেখে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বাড়তি আয়। অন্যদিকে এই উৎসবে যেসব পণ্য বেশি বিক্রি হয় এগুলো হলো-কুরবানিযোগ্য পশু (গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ও উট), পোশাক, মসলা এবং ইলেট্রনিক পণ্য। এছাড়াও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার চামড়ার বাজার রয়েছে। তবে এ বছরও সিন্ডিকেটের কবলে ছিল সম্ভাবনাময় চামড়া খাত। তাদের মতে, যে কোনো উৎসব অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। কেননা উৎসব ঘিরে বিভিন্ন খাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘনঘন হাতবদল হয়। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন বাড়ে, তেমনই মানুষের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। বাড়ে সরকারের রাজস্ব আয়। সবকিছু মিলিয়ে এবারের ‘ঈদ অর্থনীতি’ জনজীবনে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও কিছুটা স্বস্তি দিতে সক্ষম হয়েছে।

জানতে চাইলে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস-এর (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজ) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে. মুজেরী সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘দেশের উৎসবগুলোর মধ্যে কুরবানি অন্যতম। তবে আমি শুধুই ধর্মীয় উৎসব হিসাবে দেখছি না। বরং এটি দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নের বাহক। কারণ, এর মাধ্যমে ছোট-বড় নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়। বৈষম্য কমে আসে এবং সুষম বণ্টনে সহায়ক হয়। অর্থাৎ এটি অর্থনীতির একধরনের চালিকাশক্তি।’ তিনি বলেন, এই উৎসবে সবচেয়ে বড় আয়োজন পশু জবাই। ফলে পশু পালনের মাধ্যমে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করে। দেশে বাণিজ্যিকভাবে ইতোমধ্যে বড় বড় খামার তৈরি হয়েছে। ছোট ছোট উদ্যোক্তাও তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্যও আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাড়তি টাকার প্রবাহের কারণে কিছুটা মূল্যস্ফীতি হয়। তবে সবার হাতে টাকা থাকায় এতে খুব বেশি সমস্যা হয় না। সবকিছু মিলে এই উৎসবকে ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারলে অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই নেতিবাচক ছিল অর্থনীতি। এ অবস্থায় ইরান যুদ্ধ অর্থনীতির হিসাবনিকাশ পালটে দেয়। সবকিছু মিলে অর্থনীতি বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে। এ অবস্থায় ২৮ মে দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে মুসলমানদের দ্বিতীয় ধর্মীয় উৎসব কুরবানির ঈদ। এই ঈদে বাড়তি টাকার প্রবাহ আসে নানা খাত থেকে। ঈদ বোনাস, রেমিট্যান্স, পশু কেনাবেচা, ঈদ কেনাকাটাসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমাজের সর্বস্তরে কমবেশি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বোনাসের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বাড়তি কত টাকা যুক্ত হয়, এর সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা বলছে, প্রায় ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ঈদের বোনাস পান। দোকান কর্মচারী, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেসরকারি খাতে বোনাস পান আরও ৬০ লাখের বেশি শ্রমিক। সবমিলিয়ে ৮০ লাখের বেশি মানুষ ঈদের বোনাস পান। বোনাসের এই টাকা ঈদ অর্থনীতিতে যোগ হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের টাকা। কুরবানিকে সামনে রেখে ২৪ মে পর্যন্ত ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। দু-একদিনের মধ্যে পুরো মাসের তথ্য মিলবে। তবে ব্যাংকাররা ধারণা করছেন, এবার ঈদ উপলক্ষ্যে এই রেমিট্যান্স প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। কুরবানির মূল আকর্ষণ গবাদি পশু। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্য বলছে, এবার দেশে ১ কোটি ১ লাখ পশু কুরবানি হয়েছে। তবে তারা বলছেন, প্রকৃত তথ্য পেতে আরও এক সপ্তাহ লাগতে পারে। এছাড়াও চামড়া, মসলা, দা, বঁটি, পরিবহণ, পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের বিশাল কর্মযজ্ঞ ছিল। সব মিলিয়ে এবারের কুরবানির অর্থনীতি ছাড়াতে পারে এক লাখ কোটি টাকা। তবে পশু কুরবানির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে চামড়া ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, কুরবানির সময় বিভিন্ন পশুর ৯০ লাখ থেকে এক কোটি চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে মোট চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সরবরাহ করা হয় কুরবানির ঈদে। চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ খাতের মূল বাজার ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বাজারসহ এ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। তবে চামড়া ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে এবার সাধারণ মানুষ চামড়ার ন্যায্য মূল্য পাননি।

জানা যায়, প্রতিবছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন। রসুনের চাহিদা ৫ লাখ এবং আদা ৩ লাখ টন। এর উল্লেখযোগ্য অংশই কুরবানিতে ব্যবহার হয়। অন্যদিকে মসলাজাতীয় পণ্য, বিশেষ করে এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতার উল্লেখযোগ্য অংশ কুরবানিতে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে গত অর্থবছরে ২ হাজার ৫০০ টন এলাচ, ৭ হাজার ৬০০ টন দারুচিনি, ১৭০ টন লবঙ্গ এবং ৩৭০ টন জিরা আমদানি করা হয়েছে। কুরবানির বাজারে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে এসব পণ্যের। কুরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো কামার আইটেম। ছুরি, বঁটি, দা, চাপাতি, কুড়াল, রামদা ছাড়া কুরবানিই সম্ভব নয়। সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কুরবানিতে পণ্যটির বাজার এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর এক সমীক্ষায় বলা হয়, ঈদে পরিবহণ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হয় ৬০০ কোটি টাকা। এই উৎসবে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব খাতে নিয়মিত প্রবাহের বাইরে অতিরিক্ত যোগ হচ্ছে। এর বাইরে আরও কয়েকটি খাতের কর্মকাণ্ড অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৬:৩৬ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬

bankbimarkhobor.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

[abm_bangladesh_map]
advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক
মোঃ ইসলাম শেখ
কার্যালয়

৭৯, সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড, (৩য় তলা, বাম দিক), সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭

01760742336

bankbimarkhobor@gmail.com