| বুধবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৫ | প্রিন্ট | 106 বার পঠিত
অনিয়মের আখড়া ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) অনুমোদন ছাড়াই রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ১৭.২৯ কাঠা জমি কিনেছে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স। শুধু তাই নয়, এই জমি কিনতে আইনগত বিনিয়োগ সীমাও লঙ্ঘন করেছে কোম্পানিটি। কোম্পানিটির বিনিয়োগ সংক্রান্ত এক তদন্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরেছে আইডিআরএ’র তদন্ত কমিটি। একইসঙ্গে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের তথ্যও উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে। স্থাবর সম্পত্তি কেনায় অতিরিক্ত বিনিয়োগ করে আইন লঙ্ঘনের মতো ঘটনাও ঘটেছে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সে।
এছাড়া, পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানির উদ্যোক্তাংশ বীমা আইন ২০১০ এর তফসিল -১ অনুযায়ী সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স।
তদন্ত কমিটি বলছে, কোম্পানির মোট পরিশোধিত মূলধন ৮৩ কোটি ৮৮ লক্ষ টাকা, তন্মধ্যে কোম্পানির উদ্যোক্তাংশ তিন কোটি ৯০ লক্ষ টাকা।
আইডিআরএ’র তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ২০১২ সালের ২৮ জুন ও ২০১৩ সালের ০১ জানুয়ারি কোম্পানি তিনটি দলিলের মাধ্যমে সর্বমোট ১৭.২৯ কাঠা জমি ক্রয় করেছে। যেখানে জমির মূল দাম দেখানে হয়েছে ৪৩.৮২ কোটি টাকা, রেজিস্ট্রেশন খরচ ৪.১৬ কোটি টাকা ও উন্নয়ন বাবদ ৫.১৬ কোটি টাকাসহ সর্বমোট ৫৩.১৪ কোটি টাকা। তবে তদন্ত কমিটির কাছে এই জমি ক্রয়ে আইডিআরএ’র কোনো অনুমোদনের কপি দেখাতে পারেনি ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স। একই সঙ্গে এই জমি ক্রয়ে আইন লঙ্ঘন করে ৩৫.০৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত বিনিয়োগ করা হয়েছে বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি বলছে, নন-লাইফ বীমাকারীর সম্পদ বিনিয়োগ ও সংরক্ষণ প্রবিধানমালা ২০১৯ অনুযায়ী, মোট সম্পদের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ স্থাবর সম্পদে বিনিয়োগ করা যায়। কোম্পানি স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিনিয়োগ এবং সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে নন লাইফ বীমাকারীর সম্পদ বিনিয়োগ ও সংরক্ষণ প্রবিধানমালা ২০১৯ লঙ্ঘন করেছে।
এছাড়া কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ২০১৩ সালের ০১ জানুয়ারি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জমি কিনে কর্তৃপক্ষের জিএডি সার্কুলার ১০/২০১২ লঙ্ঘন করেছে কোম্পানিটি।
সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে ২২ কোটি টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ভেঙেছে আইনি সীমা। এখানেও আইন লঙ্ঘন করে ৩ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত বিনিয়োগ করেছে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স।
আইডিআরএ’র তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেডে ৩৩ লক্ষ টাকা স্থায়ী আমানত হিসেবে রেখেছে। কোম্পানি বারবার স্থায়ী আমানতের এই টাকা নগদায়নের চেষ্টা করেও প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে তুলেতে পারেনি। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ফলে কোম্পানিটির সম্পদ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে আইডিআরএ’র তদন্ত কমিটি।
সূত্র জানায়, ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় তদন্তে ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর কমিটি গঠন করে আইডিআরএ। ওই বছরের ২৩ নভেম্বর এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত কমিটি। ওই প্রতিবেদনে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের বিনিয়োগ নিয়ে বেশ কিছু অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে আইডিআরএ’র কমিটি।
এতে বলা হয়, বিতর্কিত ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেডে কোম্পানির ৩৩ লক্ষ টাকা স্থায়ী আমানত রাখা হয়েছিল। কোম্পানি ২০১৬ সালের ২৮ জুন ও ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই ওই আমানত থেকে টাকা নগদায়নের জন্য চিঠি দিলেও এখন পর্যন্ত ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোনো টাকা ফেরত পায়নি। পরবর্তীতেও স্থায়ী আমানত নগদায়নের তাগিদ দিয়ে ধারাবাহিকভাবে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেসকে ২০ নভেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত আটটি চিঠি দেয়া হয়।
তবে কোন মানদন্ডের ভিত্তিতে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসে এই অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে সে সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রও আইডিআরএ’র তদন্ত কমিটিকে দেখাতে পারেনি ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স। এমনকি এই বিনিয়োগের জন্য সিদ্ধান্ত হয়েছে বোর্ড সভার এমন কোনো কার্যবিরণীও দেখাতে পারেনি।
শুধু তাই নয়, বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য এড়িয়ে যেতে বীমা আইনের বিধান অনুযায়ী প্রতি তিন মাস পরপর বিনিয়োগ রিটার্ন কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল না করে; ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ২০২৩ সালে শুধু তৃতীয় প্রান্তিক শেষ হওয়ার এক মাস ২৫ দিন পর তৃতীয় প্রা
ন্তিকের বিনিয়োগ রিটার্ন আইডিআরএ দাখিল করেছে। যা বীমা আইন এবং বীমাকারীর সম্পদ বিনিয়োগ ও সংরক্ষণ প্রবিধানের লঙ্ঘন।
স্থাবর সম্পদ ও সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে বিনিয়োগে আইন লঙ্ঘন করায় কোম্পানি ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে ওই প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছে আইডিআরএ’র তদন্ত কমিটি।
তদন্ত দলের প্রধান ও আইডিআরএ’র সহকারী পরিচালক মো. শামসুল আলম খান এবং তদন্ত দলের সদস্য মুহাম্মদ শামছুল আলম ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে ওই সুপারিশ করেন।
কোম্পানিটিতে সংঘটিত এসব অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সেলিম জানান, তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কিছু বলতে পারছেন না। তবে বক্তব্য জানাতে সময় নিয়েও দুই সপ্তাহে তিনি এ বিষয়ে সদুত্তর দেননি।
Posted ৪:০৯ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৫
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam