শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

উৎসে কর প্রত্যাহার করলে জীবন বীমা আরো আকর্ষণীয় হবে

  |   বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   126 বার পঠিত

উৎসে কর প্রত্যাহার করলে জীবন বীমা আরো আকর্ষণীয় হবে

উৎসে কর প্রত্যাহার করলে জীবন বীমা আরো আকর্ষণীয় হবে

যেকোনো দেশে অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় যে ধরনের আর্থিক সেবার কথা বিবেচনায় আনা হয়, সেখানে জীবন বীমা একটি অপরিহার্য উপাদান। অথচ বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনো বীমার বাইরে রয়ে গেছে। ফলে ব্যক্তি পর্যায়ে কোনো দুর্ঘটনা বা অসুস্থতা মানেই ব্যক্তি ও পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়। এতে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা খাতেও ব্যয় বাড়ছে। জীবন বীমা খাতকে ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা ও উদ্যোগের মাধ্যমে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেয়া হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে।

জীবন বীমা খাতের বিকাশ নির্ভর করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ওপর। যত বেশি মানুষ জীবন বীমার আওতায় আসবে, প্রতিষ্ঠানগুলো তত বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হবে, দক্ষতা বাড়াবে, নতুন পণ্য আনবে ও সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে উঠবে। ২০২৫-২৬ বাজেটে আমরা এমন কিছু নীতিগত পদক্ষেপ আশা করি, যা জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উৎসাহিত করবে।

মেটলাইফ বাংলাদেশে ১৯৫২ সাল থেকে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে জীবন বীমা সেবা প্রদান করে আসছে। বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান দীর্ঘমেয়াদি বিদেশী বিনিয়োগকারী (এফডিআই) হিসেবে আমরা প্রায় ১০ লাখ ব্যক্তি ও ৯০০ প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহককে জীবন ও স্বাস্থ্য বীমা সেবা দিচ্ছি এবং ১৩ হাজারের বেশি এজেন্টের কর্মসংস্থান তৈরি করেছি। মেটলাইফ বাংলাদেশ সরকারের ট্রেজারি বন্ডের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগকারী এবং অন্যতম সেরা করদাতা।

বাংলাদেশে ৭২ বছরের বেশি সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও আর্থিক খাতে অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আসন্ন বাজেটে জীবন বীমা খাতের জন্য তিনটি প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কারের প্রস্তাব দিতে চাই, যাতে বীমা খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়।

এক. জীবন বীমাকে আরো গ্রাহকবান্ধব করা

জীবন বীমা ম্যাচুরিটির বা মেয়াদপূর্তির টাকার (ইন্স্যুরেন্স ম্যাচুরিটি ভ্যালু) ওপর যে উৎসে কর (Tax Deducted at Source) আরোপ করা হয়, তা বর্তমানে ৫ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। এর কারণ জীবন বীমা একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সেবা। মূলত নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার জন্য একজন গ্রাহক বছরের পর বছর ধরে তার টাকা বীমা পলিসিতে জমা করেন। কিন্তু পলিসি মেয়াদপূর্তির পর যখন তিনি সেই টাকা তুলতে যান, তখন তাতে উৎসে কর কেটে নেয়া হয়—যা গ্রাহকের আর্থিক পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটায়। এটা বীমার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয় এবং সম্ভাব্য গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করে। এ উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করলে জীবন বীমা আরো আকর্ষণীয় হবে এবং অনেক নতুন গ্রাহক বীমার আওতায় আসতে আগ্রহী হবেন বলে মনে করি।

এতে সরকারের রাজস্ব আয় কমার কোনো কারণ নেই। কেননা এ উৎসে কর্তিত কর পরবর্তী সময়ে করদাতারা তাদের বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে সমন্বয় করে নেন। অর্থাৎ সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে এর প্রভাব পড়বে না। বরং এ ধরনের করছাড় বীমা খাতকে বড় পরিসরে জনপ্রিয় করবে, যা অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক ও সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

দুই. এজেন্টদের জন্য বীমা পেশাকে আরো আকর্ষণীয় করা

বর্তমানে বীমা এজেন্টদের যেকোনো অংকের বীমা কমিশনের ওপর উৎসে কর কর্তন করা হয়। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত একজন করদাতাকে কোনো আয়কর দিতে হয় না। একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে বীমা এজেন্টদের কমিশনের ওপর উৎসে কর কাটা অব্যাহতি দেয়া উচিত।

বাংলাদেশে বীমা নেয়ার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ এখনো কম। এর একটি বড় প্রভাব পড়েছে বীমা এজেন্টদের আয়েও। তাদের আয় পুরোপুরি নির্ভরশীল বীমা পলিসি বিক্রয়ের কমিশনের ওপর। এই সীমিত আয়ের ওপর উৎসে কর আরোপ করার ফলে নিম্ন আয়ের এজেন্টদের মাসিক আয় কমে যায়। ফলে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত খরচ ও পরিবারের ব্যয় নির্বাহে সমস্যায় পড়েন। এ কর কমানো হলে বিপুলসংখ্যক এজেন্টের জন্য এটি হবে বাস্তবিক সহায়তা।

দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ২৬ লাখ মানুষ বেকার। তবে প্রকৃত সংখ্যাটি আরো অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে যদি কমিশনের ওপর উৎসে কর মওকুফ করা হয় তাহলে আরো অনেক মানুষ বীমা এজেন্ট হিসেবে যুক্ত হতে আগ্রহী হবেন। এটি একদিকে যেমন মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে বীমা খাতের সম্প্রসারণ এবং মানুষের সুরক্ষার পরিধি বাড়বে।

তিন. বিনিয়োগকারীদের জন্য জীবন বীমা খাতকে আরো আকর্ষণীয় করা

বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য কর হার কমানো হলে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। বর্তমানে বীমা কোম্পানির ওপর করপোরেট ট্যাক্স হার ৪০ শতাংশ, যা এ খাতের বিকাশে একটি বড় বাধা। এটি ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত। বীমা খাত ব্যক্তি ও পরিবারের আর্থিক ঝুঁকি কমিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সামাজিক সুরক্ষার খরচ হ্রাসে সহায়তা করে। এ কর ছাড় বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক প্রসার যেমন নিশ্চিত করবে, তেমনি এটি টেকসই উন্নয়ন ও সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোকে শক্তিশালী করবে। অন্যদিকে প্রতিযোগিতামূলক কর হার থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগ্রহী হয়।

আমাদের প্রতিবেশী ও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশে বীমা খাতের জন্য অনেক বেশি অনুকূল কর হার বিদ্যমান, যেমন ভিয়েতনামে ২০ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৩০ শতাংশ, সৌদি আরবে ২০ শতাংশ ও নেপালে ২৫ শতাংশ। অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশ বীমা খাত সংকোচনমূলক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কর হার কমালে খাতটি আবার নতুন করে গতি পাবে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও দীর্ঘমেয়াদে বাড়বে।

জীবন বীমা খাতের বিকাশ শুধু একটি নির্দিষ্ট শিল্পের অগ্রগতি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

আসন্ন বাজেটে যদি জীবন বীমা খাতের জন্য বাস্তবমুখী ও ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা গৃহীত হয়, তাহলে তা আরো গতিশীল হবে। এতে দেশের কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবেন এবং সরকারের জন্যও তৈরি হবে একটি শক্তিশালী ও টেকসই রাজস্ব উৎস। এখনই সময় জীবন বীমার মতো একটি সম্ভাবনাময় খাতকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেয়ার।

 

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫

bankbimarkhobor.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জীবন বীমা বাড়ছে
(315 বার পঠিত)
[abm_bangladesh_map]
advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক
মোঃ ইসলাম শেখ
কার্যালয়

৭৯, সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড, (৩য় তলা, বাম দিক), সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭

01760742336

bankbimarkhobor@gmail.com