ব্যাংক ডেস্ক | বুধবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | প্রিন্ট | 107 বার পঠিত
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রায় ১২১ কোটি টাকা খরচ নিয়ে আপত্তি তুলেছে বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর। প্রধান কার্যালয়সহ ৮টি শাখা অফিসের ২০২১-২২ অর্থবছরের হিসাব সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে উৎসাহ বোনাস, বিলম্বে যাতায়াত ভাতা, দুপুরের খাবারে ভর্তুকি এবং গাড়ি কেনার ঋণ বাবদ ওই পরিমাণ খরচকে বিধিবহির্ভূত বলেছে অধিদপ্তর।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করেছে, পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুসারে উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়েছে। খাবারে ভর্তুকি দেওয়ার জন্য প্রশাসনিক পরিপত্র রয়েছে। গাড়ি কেনার ঋণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় দলিল অধিদপ্তরকে সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া গাড়ির নিবন্ধন সনদ এবং বিআরটিএর নিবন্ধন সম্পর্কিত তথ্যের অসামঞ্জস্যের বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রস্তুত করা অধিদপ্তরের কমপ্লায়েন্স অডিট ইন্সপেকশন প্রতিবেদনটি সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর পর আরও কিছু প্রক্রিয়া শেষ করে প্রতিবেদনটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় এবং এর অধীন মতিঝিল, সদরঘাট, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল এবং রংপুর কার্যালয়ে নিজস্ব কর্মীদের ২০২১-২২ অর্থবছরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত ৫২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বাড়তি উৎসাহ বোনাস দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব কার্যালয়ে নিরীক্ষাকালে উৎসাহ বোনাস-সংক্রান্ত বিল-ভাউচার যাচাইকালে দেখা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের পাঁচ গুণ উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়েছে। অথচ অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ-সংক্রান্ত পরিপত্র অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আর্থিক বছরের মুনাফা কার্যকরী মূলধনের ১ দশমিক ৫ শতাংশ বা এর বেশি হলে মূল বেতনের সর্বোচ্চ আড়াই গুণ হারে উৎসাহ বোনাস দেওয়া যাবে। এ নির্দেশনা লঙ্ঘন করে বাড়তি বোনাস দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ (সংশোধন ২০০৩) অনুসারে জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোনো আর্থিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাড়তি বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন নেয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাড়তি উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়েছে। তবে এমন ব্যাখ্যা আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে অডিট অধিদপ্তরকে জানাতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, যথাযথ পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি নিয়েই এসব খরচ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো আইনের ব্যত্যয় ঘটানো হয়নি।
গবেষণা সংস্থা পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মনীতি পরিপালন করতে হয়। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও বেশি স্বচ্ছ থাকা উচিত।
গাড়ি ঋণে অনিয়মের অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়, মোটরকার ক্রয়ের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সব ধরনের গাড়ির মূল্য বাবদ ৩০ লাখ টাকার একটি ভাউচার থাকলেও ব্লু-বুকসহ ব্যাংকের অনুকূলে বন্ধকি (হাইপোথিকেশন) সম্পাদনের তথ্য নথিতে পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া গাড়ি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দাখিল সম্পর্কিত কোনো তথ্যও বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে পাওয়া যায়নি। কিছু কর্মকর্তার বন্ধকীকৃত গাড়ির নিবন্ধন তথ্য বিআরটিএর ওয়েবসাইটে যাচাই করে পাওয়া যায়নি। মোটরগাড়ি ঋণের অপব্যবহারের প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ঋণগৃহীতার দাখিল করা নিবন্ধন সনদ ও ফিটনেস সনদের সঙ্গে বিআরটিএর নিবন্ধন সম্পর্কিত তথ্যের অসামঞ্জস্যতার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই করছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করে অডিট অধিদপ্তরকে অবহিত করা হবে।
খাবারের ভর্তুকির ১৮ কোটি টাকা নিয়ে আপত্তি
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দুপুরের খাবারে ভর্তুকি বাবদ ১৭ কোটি ৯১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কর্মীদের প্রতি কর্মদিবসে ২০০ টাকা করে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। অথচ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা বেতন ও ভাতা আদেশ অনুযায়ী প্রথম গ্রেড থেকে দশম গ্রেডের কর্মকর্তাদের লাঞ্চ ও টিফিন ভাতার সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ২০১২ সালের ২৯ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা প্রশাসনিক পরিপত্র অনুসারে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রতি কর্মদিবসে অফিসে উপস্থিত বা দায়িত্ব পালন সাপেক্ষে দুপুরের খাবারের জন্য ২০০ টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়।
অন্যান্য আপত্তি
অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে প্রথম থেকে দশম গ্রেডের কর্মকর্তাদের অফিস সময়ের অতিরিক্ত কাজের জন্য দৈনিক ৩৫০ টাকা এবং ছুটির দিন কাজের জন্য ৭০০ টাকার হারে যাতায়াত ভাতা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। অধিদপ্তর বলেছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের বেতন ও ভাতা আদেশ অনুযায়ী ১১তম গ্রেড হতে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মস্থল হলে মাসিক ৩০০ টাকা যাতায়াত ভাতা পান। কিন্তু প্রথম থেকে দশম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য এ সুবিধা রাখা হয়নি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যাতায়াত ভাতা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া অধিদপ্তর বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যাংকের আবাসিক ভবনে থেকেও বাড়ি ভাড়া ভাতা পেয়েছেন। এতে ব্যাংকের ৭৯ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।
Posted ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam