অর্থনীতি ডেস্ক | শনিবার, ০৮ জুলাই ২০২৩ | প্রিন্ট | 232 বার পঠিত
ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ের যে খরচ, সেটা ভবিষ্যতে অনেক ব্যাংক নিতে পারবে না। নতুন প্রজন্ম প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের তুলনায় এ ধরনের ব্যাংকিং-এ বেশি আগ্রহী। সিঙ্গাপুর, ফিলিপিনের মতো দেশেও দেখা গেছে, প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় ডিজিটাল ব্যাংক মানুষ বেশি পছন্দ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান ২০২২ সালে ডিজিটাল ব্যাংক চালু করেছে। সারা বিশ্বে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলো যখন প্রথাগত ফিজিক্যাল ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের দিকে ঝুঁকছে, ঠিক সেই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালু করতে যাচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রথাগত ব্যাংকের সংখ্যা ৬১টি। ২০৪১ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ব্যাংকিং লেনদেন ক্যাশলেস করার সরকারের যে লক্ষ্য, তা বাস্তবায়নের জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিংই একমাত্র উপায়। কারণ ডিজিটাল পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এমএফএসের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রচলিত ব্যাংক সময় নির্ভর, অনেক সেবার জন্য সশরীরে যেতে হয়। ঋণ নেওয়া, আমানত খোলা, স্টেটমেন্ট নেওয়ার জন্য অনেক সময় ব্যাংকে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে কাগজপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। কিন্তু এসব ব্যাংকে সেসব করতে হবে না। কিন্তু সব ধরনের সেবাই পাওয়া যাবে। লেনদেনের সকল বিষয় হবে ভার্চুয়ালি। মোবাইল বা অ্যাপ ব্যবহার করে গ্রাহকরা এই ব্যাংকে লেনদেন করতে পারবেন।
দেশে ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতানুগতিক পদ্ধতিতে কাগুজে নথি জমা দিয়ে নয়, ডিজিটাল পদ্ধতিতেই ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য আবেদন করতে হবে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র ডিজিটাল উপায়েই জমা দিতে হবে। আবেদন ফি হবে পাঁচ লাখ টাকা, যা অফেরতযোগ্য। আর এই ব্যাংক খুলতে ন্যূনতম মূলধন লাগবে ১২৫ কোটি টাকা। নতুন এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক চাইছে, বিদেশি কোনো ডিজিটাল ব্যাংক তথা সফট ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসুক। কারণ, তাদের উচ্চ প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ সবই রয়েছে। তারা এ দেশে ডিজিটাল ব্যাংকের সঙ্গে থাকলে গ্রাহকেরাও আস্থা পাবেন, তাদের আমানতও সুরক্ষিত থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের নীতিমালা চূড়ান্ত করার পর এ ব্যাপারে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে নীতিমালার পাশাপাশি আবেদনের যাবতীয় ছক দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো শাখা, উপশাখা, এটিএম বুথ বা কোনো স্থাপনা থাকবে না। মোবাইলফোন বা ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার করেই ব্যাংকিং সেবা দেওয়া হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী চলবে এই ব্যাংক। ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের মূলধন সংরক্ষণ চুক্তি করতে হবে। কোনো ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়লে তা উদ্যোক্তাদের জোগান দিতে হবে। ঋণখেলাপি কেউ ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা হতে পারবেন না। এমনকি ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের কারও বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি সংক্রান্ত কোনো মামলা আদালতে চলমান থাকলে তারাও আবেদন করার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। মূলধন কম লাগবে বলে স্পন্সরদের জন্য প্রথাগত ব্যাংগুলোর তুলনায় ডিজিটাল ব্যাংকের অংশীদারিত্ব পাওয়া সহজ হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের খসড়া গাইডলাইনে ফিনটেক কোম্পানি, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস), ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের জন্য যৌথ উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে উত্সাহিত করেছে। ইতিমধ্যে অনেকেই এ বিষয়ে যোগাযোগ করছেন।
ডিজিটাল ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবিধান মেনে প্রচলিত ব্যাংক বা এমএফএস প্রদানকারীদের এজেন্টদের ব্যবহার করতে পারবে। তবে ডিজিটাল ব্যাংকের নিজস্ব কোনো এজেন্ট থাকবে না। ডিজিটাল ব্যাংক অনলাইন এন্ড-টু-এন্ড প্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে দক্ষ, সাশ্রয়ী ও উদ্ভাবনী ডিজিটাল আর্থিক পণ্য ও পরিষেবা সরবরাহ করবে। এটি গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে এবং সেবাবঞ্চিত, কম সেবা পাওয়া ও প্রত্যন্ত এলাকার (পার্বত্য জেলা, দ্বীপ ইত্যাদি) মার্কেট সেগমেন্টকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনতে এআই, মেশিন লার্নিং, ব্লকচেইন ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অন্যান্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। ডিজিটাল ব্যাংকগুলো কোনো ওভার-দ্য-কাউন্টার (ওটিসি) সেবা দেবে না। এদের নিজস্ব কোনো শাখা বা উপশাখা, এটিএম/সিডিএম/সিআরএমও থাকবে না। গ্রাহকদের লেনদেনের সুবিধার্থে ডিজিটাল ব্যাংক ভার্চুয়াল কার্ড, কিউআর কোড ও অন্য কোনো উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য দিতে পারে। কিন্তু লেনদেনের জন্য কোনো ফিজিক্যাল উপকরণ দেওয়ার অনুমতি নেই এ ব্যাংকের। ডিজিটাল ব্যাংকগুলো প্রবাসী কর্মীদের রেমিট্যান্স সংগ্রহ করা ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন বা বাণিজ্য অর্থায়নে যুক্ত হতে পারবে না। ডিজিটাল ব্যাংকগুলোকে কোম্পানি আইন অনুযায়ী সময়ে সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ন্যূনতম নগদ জমা (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) বজায় রাখতে হবে। ডিজিটাল ব্যাংককে সময়ে সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও-ও (এডিআর) বজায় রাখতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা সবার জন্য সমান এবং স্বচ্ছ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেকে মধ্যে। অন্যদিকে প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেকের দক্ষতার অভাব এবং প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক মোবাইল ফোন না থাকায় তাদের এ ধরনের ব্যাংকিংয়ের সেবা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের ‘ক্যাশলেস লেনদেনে’ উত্সাহিত করার চেষ্টা করা হলেও এখনো অনেকে নগদ লেনদেনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষ, নগর জীবনের বাইরের মানুষকে এই সেবার আওতায় আনা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যেভাবে মানুষজন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, তাতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার সঙ্গেও কয়েক বছরের মধ্যেই মানুষ খাপ খাইয়ে নেবে। সেই সঙ্গে সাইবার সিকিউরিটির বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। নতুন এই প্রযুক্তি বাংলাদেশে যখন আসবে, এর সঙ্গে তথ্য প্রযুক্তিবিদদের সম্পৃক্ত করে এগিয়ে নিতে হবে।
Posted ২:২৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৮ জুলাই ২০২৩
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam