| সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | 63 বার পঠিত
দীর্ঘদিন স্থগিত থাকার পর বীমা খাতের সংশ্লিষ্টদের দাবির প্রেক্ষিতে গত বছরের আগস্টে ‘মোটর লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স’ নামে থার্ড পার্টি মোটর বীমা পুনরায় চালু করা হলেও এতে গ্রাহকের আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) নতুন কাঠামোতে এই পলিসি চালু করলেও এটি ঐচ্ছিক হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের সাড়া খুবই সীমিত। আগের তুলনায় প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জটিল প্রক্রিয়াও এর জনপ্রিয়তা হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাধারণ মোটরসাইকেল চালক ও যানবাহন মালিকদের মধ্যে এ ধরনের বীমা সম্পর্কে সচেতনতা এখনও খুবই কম। অনেকেই মনে করেন, সতর্কভাবে গাড়ি চালালেই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব, ফলে অতিরিক্ত ব্যয় করে বীমা করার প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করছেন না।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় গ্রাহকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই পলিসি গ্রহণে আগ্রহী হচ্ছেন না। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতার কারণেও সাধারণ মানুষের কাছে এটি আকর্ষণ হারাচ্ছে।
ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান তারেক বলেন, বাধ্যতামূলক না হওয়ায় এই পলিসির প্রতি গ্রাহকের আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে না। অন্যদিকে ঢাকা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বায়েজিদ মুজতবা সিদ্দিকী জানান, ব্যাংক বা সরকারের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক করা হলে তবেই গ্রাহকরা এ ধরনের পলিসি গ্রহণ করে থাকেন; অন্যথায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বীমা করার প্রবণতা কম।
তবে আইডিআরএ’র এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যানবাহনের থার্ড পার্টি বীমা না থাকলে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’-এ জরিমানার বিধান অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যদিও এটি এখনো কার্যকর হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনায় বীমার ক্ষতিপূরণের সীমা বৃদ্ধি, দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন এবং পলিসিটিকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি। অন্যথায় এটি কেবল কাগুজে বীমা হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত ব্যক্তিদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘মোটর লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স’ পলিসি চালুর অনুমোদন দেয় আইডিআরএ। নতুন এই পলিসির আওতায় দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা এককালীন ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
৭ আগস্ট জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে (নং- নন-লাইফ ১০৫/২০২৫) এই পলিসি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগে ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত সেন্ট্রাল রেটিং কমিটির ১৮৫তম সভার সুপারিশ এবং ৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত কর্তৃপক্ষের ১৮৮তম সভায় এটি অনুমোদিত হয়। তবে পলিসিটি ঐচ্ছিক হিসেবে চালু হওয়ায় এটি গ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়।
নতুন পলিসিতে যানবাহনের ধরন ও সিসি অনুযায়ী প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন—১৫০ সিসির মোটরসাইকেলের জন্য প্রিমিয়াম এক হাজার ৬ টাকা, ৩৫০ সিসির চার আসনের ত্রিচক্রযানের জন্য এক হাজার ৬৯৬ টাকা এবং ১৩০০ সিসির পাঁচ আসনের প্রাইভেট কারের জন্য দুই হাজার ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া তিন টন ক্ষমতার ট্রাকের জন্য প্রিমিয়াম তিন হাজার ৬৫১ টাকা ধার্য করা হয়েছে।
এই পলিসির আওতায় দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা সম্পূর্ণ স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে জনপ্রতি সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে। আংশিক স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা প্রদান করা হবে।
এছাড়া যানবাহনের ক্ষতির জন্য সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা এবং আদালত ফি, সালিশ ব্যয় ও আইনি প্রতিনিধিত্বসহ সংশ্লিষ্ট খরচ বাবদ সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা প্রদান করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পলিসি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের নন-লাইফ বীমা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে এবং বীমা ব্যবহারের হার বৃদ্ধি পেতে পারে। এর মাধ্যমে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। তবে বাধ্যতামূলক না করা হলে এর সুফল সীমিতই থেকে যাবে বলে তারা মনে করছেন।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বর জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে যানবাহনের থার্ড পার্টি বীমা বাতিল করা হয়েছিল। এর আগে মোটরযান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ বাতিল করে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ কার্যকর হওয়ার পর সরকার এই বীমা ব্যবস্থা তুলে দেয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৬ লাখ ৬১ হাজার।
আইডিআরএ জানিয়েছে, বীমা বাধ্যতামূলক না থাকায় এসব যানবাহন থেকে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৮৭৮ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর মধ্যে ভ্যাট ও কর বাবদ ৮৪৯ কোটি টাকা এবং স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ প্রায় ২৮ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত।
Posted ৫:০৬ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam