| সোমবার, ১৬ জুন ২০২৫ | প্রিন্ট | 71 বার পঠিত
আওয়ামী লীগের রাহুমুক্ত হয়নি এনআরবি ইসলামিক লাইফ
ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পতনে আর্থিক খাত থেকে একে একে স্বৈরাচারের দোসররা বিতাড়িত হলেও রাহুমুক্ত হয়নি এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স। অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে কোম্পানির তহবিল উজাড় করে এখনো শীর্ষ পদগুলো আকড়ে ধরে আছে ফ্যাসিস্টের সহযোগীরা।
সূত্র জানায়, এখনো এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান পদ ধরে রেখেছে হাসিনার ঘনিষ্ঠ দোসর সর্ব ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কিবরিয়া গোলাম মোহামাদ ওরফে জি এম কিবরিয়া। তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ছাত্র হত্যা চেষ্টার মামলা হয়েছে। কিবরিয়ার বিদেশ গমন রোধ চেয়েও চিঠি দিয়েছে পুলিশ।
ফ্যাসিস্টের আরেক দোসর কিবরিয়ার স্ত্রী সর্ব ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক হোসনে আরা বেগম কাগজে কলমে কোম্পানির ওভারসিজ এজেন্সি ডিরেক্টর। তার মাধ্যমে কমিশনের নামে লুটে নেয়া হয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। যার প্রধান সহযোগী কোম্পানির বিতর্কিত সিইও ও আওয়ামী লীগের আরেক অর্থদাতা শাহ্ জামাল হাওলাদার। এই শাহ জামালও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ছাত্র হত্যা চেষ্টা মামলার আসামি।
শাহ জামাল হাওলাদারের দেশ থেকে পলায়নের শঙ্কায় তার বিদেশ গমন রোধ চেয়েও চিঠি দিয়েছে পুলিশ। রাজধানীর আদাবর থানায় দায়ের করা এক মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের স্বার্থে আদাবর থানার উপ-পরিদর্শক রাকিবুল ইসলাম ঢাকা মহানগর পুলিশের (তেজগাঁও বিভাগ) উপ-কমিশনারের মাধ্যমে পুলিশের বিশেষ শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) এবং বিশেষ পুলিশ সুপার (ল্যান্ড অ্যান্ড সী পোর্ট) বরাবর এই চিঠি দিয়েছেন।
তাদের পাসপোর্ট নম্বরসহ বিস্তারিত ব্যক্তিগত তথ্য উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আদাবর থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি কিবরিয়া গোলাম মোহামাদ (আওয়ামী লীগ নেতা ও অর্থ যোগানদাতা) এবং মো. শাহ জামাল হাওলাদার কোটা আন্দোলন দমনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। উক্ত আসামি বিদেশে চলে গেলে মামলার তদন্তে বিঘ্ন ঘটার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান। অতএব মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে উক্ত আসামি যাহাতে বিদেশে যেতে না পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। অতএব মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বর্ণিত আসামির বিদেশ গমন রোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে জনাবের মর্জি হয়।’
গত ২৯ মে ঢাকা মহানগরীর আদাবর থানায় বাদী মো. নাসির আহমেদের দায়ের করা মামলার ( নং ২৪) এজাহারে দেখা যায়, মামলাটিতে এনআরবি লাইফের চেয়ারম্যান কিবরিয়া গোলাম মোহামাদকে ৪ নাম্বার আসামি করা হয়েছে। মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা ও অর্থ যোগানদাতা হিসেবে তাকে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার ৫ নং আসামি হিসেবে কোম্পানিটির সিইও শাহ জামাল হাওলাদারের নাম উল্লেখ রয়েছে।
মামলায় ১৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৬০/৭০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার বাদী নাসির আহমেদ এজাহারে বলেছেন, আসামিরা ১৯ জুলাই আদাবরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনকালে তার ভাই ছাত্রদল কর্মী মিথুনকে পিটিয়ে, কুপিয়ে হত্যা চেষ্টা চালায় এবং পায়ে গুলি করে। পরবর্তীতে মৃত ভেবে ফেলে রেখে গেলে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।
এই মামলায় পদধারী আওয়ামী লীগ নেতা কিবরিয়াকে অর্থের যোগানদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদের এই দোসর গ্রেফতার না হয়ে এখনো কীভাবে এনআরবি লাইফে বহাল রয়েছে তা নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, হত্যা চেষ্টা মামলার আসামি হয়েও শাহ জামাল হাওলাদার কীভাবে কোম্পানিটির সিইও পদ আকড়ে রেখেছে তা নিয়েও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ফ্যাসিস্টের অর্থায়নকারী জিএম কিবরিয়া ও তার স্ত্রী হোসনে আরাকে ২০২১ সালে উপঢৌকন হিসেবে এই লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিটির লাইসেন্স দেয় পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। লাইসেন্স পেয়েই এনআরবি ইসলামিক লাইফ থেকে নানা উপায়ে অর্থ বের করত ফ্যাসিস্টের অর্থায়নকারী গোলাম কিবরিয়া। যে কারণে প্রতিষ্ঠার তিন বছরের মাথায় নানা অনিয়মে খাদের কিনারে এসে পড়েছে কোম্পানিটি। ঝুঁকির মুখে পড়েছে বীমা গ্রাহকদের আমানত। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তদন্তেও উঠে এসেছে কোম্পানিটির নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের চিত্র।
তবে অনুমোদনহীন বীমা পরিকল্প বিক্রি, আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়, পলিসি তামাদির উচ্চহার, ক্যাশ ইন হ্যান্ডের নামে অর্থ আত্মসাত, একক প্রিমিয়ামকে মেয়াদি বীমা দেখিয়ে ব্যাপক তহবিল লোপাট, সম্পদ বিনিয়োগে অনিয়মসহ নানা দুর্নীতি আর কেলেঙ্কারির বোঝা নিয়ে এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও পদে বহাল তবিয়তেই আছেন শাহ্ জামাল হাওলাদার। অথচ তার বিরুদ্ধে সবগুলো অভিযোগের সত্যতা উঠে এসেছে খোদ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনে। এসব অভিযোগে কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী পদে শাহ্ জামাল হাওলাদারের পুনঃনিয়োগের প্রস্তাবে অনুমোদন না দিয়ে নাকচ করেছে আইডিআরএ। পুনঃনিয়োগের প্রস্তাব নামঞ্জুরের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে ২০২৪ সালের ১০ জুন কোম্পানিটির চেয়ারম্যানকে চিঠি পাঠান আইডিআরএ’র পরিচালক আহম্মদ এহসান উল হান্নান।
আইডিআরএ’র ওই চিঠিতে শাহ জামাল হাওলাদার কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং দেউলিয়া পর্যায়ে নিয়ে গেছেন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি আর্থিক অনিয়ম ও অপচয়ের মাধ্যমে কোম্পানি ও গ্রাহক স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করেছেন, একইসঙ্গে কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন বলে আইডিআরএ উল্লেখ করেছে। আইডিআরএ’র ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, মো. শাহ জামাল হাওলাদারের প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনায় বীমা আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কর্মকান্ড পরিচালিত হয়েছে। যা কোম্পানি এবং বীমা গ্রাহকদের স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
Posted ৪:৪৯ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১৬ জুন ২০২৫
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam