| সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫ | প্রিন্ট | 223 বার পঠিত
ইসলামি ইন্স্যুরেন্সে খোকনের ‘মগের মুল্লুক’
রাজনীতির মাঠ দখলের মতো নন লাইফ বীমা কোম্পানি ইসলামি ইন্স্যুরেন্স দখল করে মগের মুল্লুকে পরিণত করেছে পতিত স্বৈরাচার আমলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা সাঈদ খোকন। আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার দাপটে কোনো আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে সাত উদ্যোক্তা পরিচালককে সরিয়ে নিজ স্ত্রী, তিন মেয়ে, আপন বোন, ভগ্নিপতি, শ্যালিকা, চাচা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের দুই প্রতিনিধিসহ নিজ পরিবারের মোট আটজনকে পরিচালক করে কোম্পানিকে লুটপাটের ক্ষেত্র বানিয়েছেন তিনি।
আইন অনুযায়ী, বীমা কোম্পানিতে একই পরিবার থেকে দুই জনের বেশি পরিচালক থাকার বিধান নেই। অথচ বছরের পর বছর নিজ পরিবারের আট সদস্যকে পরিচালক বানিয়ে কোম্পানিটিকে কুক্ষিগত করে রাখেন সাঈদ খোকন। গায়ের জোরে লঙ্ঘন করে গেছেন বীমা আইন, বিএসইসি, আইএএস বা আইএফআরএসসহ হিসাব আইন। শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রেও মানা হয়নি বীমাকারীর মূলধন ও শেয়ারধারণ বিধিমালা। ইসলামি ইন্স্যুরেন্সের মোট শেয়ারের ৫৬.৭৬ শতাংশ শেয়ারই সম্মিলিতভাবে সাঈদ খোকন ও তার পরিবারের দখলে রাখা হয়েছে। এরমধ্যে সাঈদ খোকনের নিজের নামে রয়েছে ২৩.৬৯ শতাংশ, তার মালিকানাধীন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠান- আরা হসপিটালিটি সার্ভিসেস লিমিটেডের নামে ৬.০৩ শতাংশ ও সাঈদ খোকন প্রোপার্টিজ লিমিটেডের নামে রয়েছে ৬.০৩ শতাংশ শেয়ার। এছাড়া সাঈদ খোকনের স্ত্রী ফারহানা আলমের নামে ১৪.৯৮ শতাংশ, শ্যালিকা রিজওয়ানা হোসেনের নামে ৬.০৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। অথচ বীমাকারীর মূলধন ও শেয়ারধারণ বিধিমালা-২০১৬ এর বিধি ৩ (৫) এ সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি বা তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ এককভাবে বা যৌথভাবে বা কোন কোম্পানি, কোন বীমাকারীর শতকরা ১০ ভাগের অতিরিক্ত শেয়ার ধারণ করতে পারবেন না।’
কোম্পানিটিতে পরিচালক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বছরের পর বছর আইন লঙ্ঘন করেছেন সাঈদ খোকন। বীমাকারীর নিবন্ধন প্রবিধানমালা, ২০১৩ এর ৩(২)(খ) অনুসারে উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের জীবনবৃত্তান্ত ফরম (বিউনিখ-খ) এর ১৮(ঠ) ক্রমিকে একই পরিবার থেকে দুই জনের বেশি পরিচালক থাকতে পারবে না বলে বিধান রয়েছে। অথচ ক্ষমতার দাপটে নিজে চেয়ারম্যানের আসন দখল করেই নিজ পরিবারের আট জনকে পরিচালকের আসনে বসিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করেছেন তিনি।
জানা যায়, ২০১২ সালে জোরপূর্বক অনিয়মতান্ত্রিকভাবে আগের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিজেই ইসলামি ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হন সাঈদ খোকন। দীর্ঘ ১৩ বছর নির্বাচন ছাড়াই বেআইনিভাবে তিনি এ পদে বহাল থেকে নানা দুর্নীতি ও অনিয়ম করেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অজ্ঞাত স্থান থেকে এখনো কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। এমনকি কোনো সভা না করেও রেজুলেশন তৈরি করে সভা করা হয়েছে বলে দেখিয়ে, মিটিং ফি সহ যাবতীয় আর্থিক সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছেন সাঈদ খোকন। এসব কাজে তাকে সহযোগিতা করছেন বিতর্কিত কোম্পানি সচিব চৌধুরী এহসানুল হক। সাঈদ খোকন কোনো নির্বাচন বা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই চাচা ইসমাইল নওয়াবকে প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারম্যান পদে বসিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সেখানে কোনো কমিটি গঠনও করা হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাধ্যবাধকতার কারণে যা করা হয়েছে, তা হয়েছে শুধু কাগজে-কলমে এবং চেয়ারম্যান সাঈদ খোকনের নির্দেশনায়।
সূত্র জানায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সভার বাধ্যবাধকতা থাকায় সাঈদ খোকন স্ত্রী, বোন, শ্যালিকা, ভগ্নিপতি, দুই নাবালিকা মেয়ে ও নিকটাত্মীয়দের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এরপর নিজেরা সভা করে রেজ্যুলুশন বা কার্যবিবরণী তৈরি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পাঠিয়েছেন।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালানোর পর আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের মতো সাঈদ খোকনও আত্মগোপনে চলে যান সপরিবারে। এরপর থেকে আর তাকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। তবে এখনো সব কিছু চলছে তার নির্দেশনাতেই।
সূত্র জানায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সভার বাধ্যবাধকতা থাকায় সাঈদ খোকন স্ত্রী, বোন, শ্যালিকা, ভগ্নিপতি, দুই নাবালিকা মেয়ে ও নিকটাত্মীয়দের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এরপর নিজেরা সভা করে রেজ্যুলুশন বা কার্যবিবরণী তৈরি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পাঠিয়েছেন। সাঈদ খোকন আগের চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিজেই ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি বোর্ড সভা করেননি এবং শরিয়াভিত্তিক কোম্পানি হওয়া সত্ত্বেও শরিয়া কউন্সিলের কোনো সভা করেননি।
পাবলিক শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে পরিচালক নির্বাচন না করে এভাবেই সাঈদ খোকন অনিয়মতান্ত্রিকভাবে নিজের বোন, মেয়ে এবং নিকটাত্মীয়কে শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বানিয়েছেন। তার বোন ও মেয়ে ২০১০ সাল থেকে পাবলিক শেয়ারহোল্ডার পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। পর্ষদের দুই স্বতন্ত্র পরিচালক জাবেদ আহমেদ সাঈদ খোকনের আপন ভগ্নিপতি এবং ইমরান আহমেদ ভাইস চেয়ারম্যানের ছেলে। আবার স্বতন্ত্র পরিচালক জাবেদ আহমেদ ও পাবলিক শেয়ারহোল্ডার পরিচালক সাঈদ খোকনের বোন শাহানা হানিফ সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী।
সাঈদ খোকন তার ভগ্নিপতি ও ভাইস চেয়ারম্যানের ছেলেকে স্বতন্ত্র পরিচালক বানিয়েছেন। এর পাশাপাাশি তাদের অডিট কমিটি ও এনআরসি কমিটিরও চেয়ারম্যান বানিয়েছেন। স্বতন্ত্র পরিচালক জাবেদ আহমেদ সাত বছর এবং ইমরান আহমেদ পাঁচ বছর ধরে কোম্পানিতে আছেন। ছয় বছর পূর্ণ হওয়ায় ২০২২ সালে জাবেদ আহমেদের স্থলে হুমায়ূন কবিরকে (সম্পর্কে সাঈদ খোকনের চাচা) নতুন স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে কাগজপত্রে দেখানো হলেও পূর্বের স্বতন্ত্র পরিচালক জাবেদ আহমেদ এখনো কাজ করে যাচ্ছেন।
শুধু তাই নয়, ডিএসসিসির মেয়র থাকাকালীনও নিয়মবহির্ভূতভাবে কোম্পানির চেয়ারম্যান পদে বহাল ছিলেন সাঈদ খোকন এবং যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাও নিয়েছেন। দেশের বাইরে বা সভায় অনুপস্থিত থেকেও তিনি সভার ফি গ্রহণ করেছেন। শুধু সাঈদ খোকনই নন, তার স্ত্রী, মেয়ে, শ্যালিকা ও বোনও দেশের বাইরে বা সভায় অনুপস্থিত থেকে সভার ফি গ্রহণ করেছেন।
সূত্র জানায়, এখনো সাঈদ খোকনের একক সিদ্ধান্তেই চলছে ইসলামি ইন্স্যুরেন্স। তার প্রধান সহযোগী হিসেবে সব অপকর্ম বাস্তবায়ন করছেন কোম্পানি সচিব চৌধুরী এহসানুল হক।
Posted ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam