| বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই ২০২৫ | প্রিন্ট | 261 বার পঠিত
বামে গুরু দত্ত ডানে ‘বাজি’র দৃশ্যে দেব আনন্দ ও গীতা বালি
ভারতীয় সিনেমার অন্যতম কিংবদন্তি নির্মাতা গুরু দত্ত। তিনি একাধারে নির্মাতা ও অভিনেতা। কিন্তু জীবদ্দশায় তার সিনেমা ও তিনি প্রকৃত মর্যাদা পাননি। এখন তাকে নিয়ে নতুন করে আলাপ ওঠে। এর মধ্যে গুরু দত্তের সিনেমা নিয়ে আলাপ হলে দুটো সিনেমার নাম প্রথমেই আসে—‘পেয়াসা’ ও ‘কাগজ কে ফুল’। নিঃসন্দেহে কালজয়ী সৃষ্টি এ দুই সিনেমা। কিন্তু এর বাইরেও তার সিনেমা আছে, যা সিনেমা হিসেবে অনুসরণীয়। একটি হলো ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফিফটি ফাইভ’। সিনেমাটি গুরু দত্তের ক্যারিয়ার বদলে দিয়েছিল। আরেকটি হলো তার প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র বাজি।

বলিউডে বহু সিনেমা তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে বেশকিছু একই ফর্মুলায় নির্মিত। এর মধ্যে প্রধান দুটি হলো ধনীর মেয়ের সঙ্গে গরিবের ছেলের প্রেম, অন্যটি দ্বন্দ্বমুখর দুই পরিবারের সন্তানদের প্রেম (রোমিও জুলিয়েট থেকে অনুপ্রাণিত)। এ দুই ধারার সিনেমাই আজ আমাদের কাছে ক্লিশে। কিন্তু একটা সময় এমন সিনেমাই দর্শক পছন্দ করত। তারা অপেক্ষা করত। সিনেমা দেখে খুশি হতো।
৭৪ বছরের পুরনো গুরু দত্তের বাজি এখন অনেকের ক্লিশে মনে হতে পারে। কিন্তু পঞ্চাশের দশকে বিষয়গুলো তেমন ছিল না। আজ যেসব দৃশ্য বা কাহিনীর বাঁক আমাদের কাছে পরিচিত বা ক্লিশে মনে হয়, সেগুলো তখন একেবারেই নতুন ছিল। অপরাধজগতের রহস্যময়তা, নারীর প্রলোভন, নৈতিক জটিলতায় ঘেরা নায়ক—এসব উপাদান হিন্দি সিনেমায় তখনো সেভাবে দেখা যায়নি। আজকের দিনে এসে হলিউড ও অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রির নয়ার ফিল্ম নিয়ে খুব আলাপ হয়, অথচ বলিউডে বাজি ছিল শহুরে ফিল্ম নয়ার ধারার সূচনা। পরে ‘শ্রী ৪২০’-এর মতো সিনেমায় বিষয়টি আরো প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর এ ধারায় আরো সিনেমা নির্মাণ হয়েছে বলিউডে।
অন্যদিকে বাজি ছিল একঝাঁক নতুন প্রতিভার মিলনক্ষেত্র। এ সিনেমার মধ্য দিয়ে গুরু দত্ত নির্মাতা হিসেবে যাত্রা করলেন। জনি ওয়াকার কৌতুক অভিনেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুললেন। এছাড়া সাহির লুধিয়ানভিরও বড় ব্রেক এটি। জোহরা সেহগাল গানগুলোর কোরিওগ্রাফি করলেন, যিনি পরবর্তী সময়ে একজন কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। এ সিনেমার সহকারী পরিচালক ছিলেন রাজ খোসলা। ছিলেন ভিকে মুর্তি, যিনি পরে গুরু দত্তের চিত্রগ্রহণের ছায়াশিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। তখন তিনি ছিলেন ক্যামেরা অ্যাসিস্ট্যান্ট।
গানের উপস্থাপনা এ সিনেমাকে বিশেষ আবহ দিয়েছে। ‘সুনো গজর ক্যা গায়ে’ গানে একটি দৃশ্য আছে। সেখানে গীতা বালি অভিনীত নীনা চরিত্রটি দেব আনন্দের মদন চরিত্রকে সতর্ক করে। অনেক সমালোচক এ গানের উত্তেজনাপূর্ণ ক্লাইমেক্স নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু গানটি অনেকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে আনাস আরিফ লিখেছেন, ‘গানটি শুরু হয় আয়নার মধ্যে নীনার মুখ দেখা দিয়ে। এরপর ক্যামেরা ধীরে টিল্ট করে ও ডলি মুভমেন্টে ক্লাবে প্রবেশ করা মদনকে ফ্রেমে আনে—একটি দৃশ্য তৈরির কাব্যিকতা, যা শুরু থেকেই গুরু দত্তের মুনশিয়ানা প্রকাশ করে। গুরু দত্তের পরবর্তী সিনেমাগুলোয় বিষয়টি দেখা যায়।’
গানের মধ্যে গল্প বলার বিষয়টি আরো অনেক সিনেমায় আছে। বাজি আরো দেখিয়ে দেয়, বিষয়টি গুরু দত্ত কতটা ভালো বুঝতেন। ‘শরমায়ে কাহে ঘবরায়ে কাহে’ বা ‘তদবির সে বিগড়ি হুয়ি তকদির’—এ গানগুলোয় কেবল সুর বা নাচ নয়, চরিত্র ও কাহিনী এগিয়ে চলে। বিশেষ করে শেষোক্ত গানটি লক্ষ করার মতো। এখানে সাহিরের গজলকে শচীন দেব বর্মণ একটি পাশ্চাত্য ছন্দে রূপান্তর করে সুর করেছেন। বিষয়টি আজও সাহসী ও অম্লান এক উদাহরণ। এরপর আরো কত কত বলিউড সিনেমায় এ কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে তার হিসাব নেই। বাজির কাছে এ কারণেও ঋণী বলিউড।
পাশাপাশি এ দৃশ্যগুলোয় আছে পরিমিতিবোধ। কোনো দৃশ্যে কোনো অতিরঞ্জিত ক্যামেরা মুভমেন্ট নেই, নেই বিশাল সেট, নেই জাঁকজমকপূর্ণ নাচ। বরং এক ধরনের নিরুত্তাপ গভীরতা—চোখে চোখে ভাষা, সংলাপের আগের নিশ্বাস, সুরের ফাঁকে থাকা নিস্তব্ধতাই গল্প বলে। গুরু দত্ত বুঝেছিলেন, কম বলেও অনেক কিছু বলা যায়।
এ প্রবণতা দেখা যায় সিনেমার প্রথম দৃশ্যেই—একজন নিঃসঙ্গ মানুষ রাস্তার কোণে বসে আছেন, ক্যামেরা যেন তাকে উপেক্ষা করছে। তিনি যে কেউ হতে পারেন, পেয়াসার কবি বিজয়, কাগজ কে ফুলের ভগ্নহৃদয় নির্মাতা সুরেশ বা শুধু গুরু দত্ত নিজেই এক অজানা শিল্পী, প্রান্তে বসে ভাগ্যের অপেক্ষায়।
বাজি আমাদের দেখায় এক গড়ে ওঠা শিল্পীকে, যিনি তখনো তার ভাষা খুঁজে চলেছেন। এ খোঁজের মধ্যেও, গুরু দত্ত এমন কিছু দেন যা অনেক শিল্পী তাদের ক্যারিয়ারের সেরা সময়েও দিতে পারেন না। কারণ প্রতিটি ফ্রেমে শুধু কারুকার্য নয়, আছে অনুভব। যেখানে অনুভব আছে, সেখানে থাকে সত্য।
Posted ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই ২০২৫
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam