শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

গণ-আদালতে বিশ্বব্যাংক আইএমএফ

  |   মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   59 বার পঠিত

গণ-আদালতে বিশ্বব্যাংক আইএমএফ

গণ-আদালতে বিশ্বব্যাংক আইএমএফ

বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কের ৫২ বছর চলছে। দুই বছর আগে দুই দেশের সম্পর্কের ৫০ বছর উদযাপন করা হয়েছে। এজন্য প্রতিষ্ঠানের এমডি সাহেব বাংলাদেশ ঘুরেও গেছেন। তখন ছিল শেখ হাসিনার কাল। সেই কালের মহাদুর্নীতি, লুণ্ঠন, সম্পদ পাচারের নানা আয়োজনকে উন্নয়ন বিস্ময় হিসেবে প্রচার করা হচ্ছিল। এখন সুর ভিন্ন থাকলেও সেই প্রচারে বিশ্বব্যাংকেরও গদগদ ভাব ছিল। বিভিন্ন দেশে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সব সরকারকে সন্তুষ্ট রাখতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ গোষ্ঠীর এ রকমই পিঠ চাপড়ানো ভূমিকা থাকে। অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ, আমলা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদদের অনেকে তাদের চিন্তা বাক্সেই আটকে থাকে, নিজেদের সুবিধা সন্ধান করে। তবে যারাই জনগণের স্বার্থ, প্রাণ প্রকৃতি, স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদার পথ অনুসন্ধান করেন তাদেরই বিশ্বব্যাংকীয় দর্শন ও কর্মসূচির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে হয়।

মনে পড়ছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর হয়েছিল ১৯৯৪ সালে, তখন তাদের উদযাপনের পাশাপাশি বিশ্বের বহু দেশে এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গণ-আদালত গঠন হয়েছিল। সবচেয়ে বড় গণ-আদালত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের নেতৃত্বে। আশির দশকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ পরিচালিত কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি বা ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’-এর বিষফল তখন ক্রমে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে বিশ্বব্যাংকও তখন কিছু পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়। সেগুলোর ফলাফল তাদের অনুকূলে যায়নি।

‘বিদেশী সাহায্য’, ‘টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স’, ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’, ‘রুটিন অ্যাডভাইজ’ ইত্যাদি নামে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি কীভাবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সাধারণ সম্পত্তি দেশী-বিদেশী ব্যক্তি মালিকানায় নিয়ে যায়, অন্ধ প্রবৃদ্ধির বদলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভাবনা বিপর্যস্ত করে এবং সর্বজনের অধিকার মুনাফামুখী তৎপরতার অধিনস্ত করে তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ এ দেশের জ্বালানি, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প, বন্দর, রেলওয়ে, পানি ইত্যাদি খাত। এসব অভিজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে ঢাকায় বিশ্বব্যাংক ও তাদের সহযোগী আইএমএফ ও এডিবির কার্যক্রম নিয়ে আমরা গণ-ট্রাইব্যুনালের উদ্যোগ গ্রহণ করি। সে বছর ৩ নভেম্বর বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে এর ঘোষণা দেয়া হয়। সেখানে আরো উপস্থিত ছিলেন লেখক ফয়েজ আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেএম সাদউদ্দীন, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, অধ্যাপক এমএম আকাশ। সংহতি জানিয়ে বার্তা পাঠান বিচারপতি মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও টিআইবির তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক মুজফফর আহমদ। সেখানে আমি যে ঘোষণা পাঠ করি তাতে বলা হয়:

এসব সংস্থার নীতিমালা গ্রহণ করে বাংলাদেশের তেল-গ্যাস ক্ষেত্রগুলো এখন বিদেশী কোম্পানির দখলে, নিজেদের গ্যাস বহুগুণ বেশি দামে আমাদের কিনতে হচ্ছে, দেশীয় সংস্থা পঙ্গু; জীবন-জীবিকা-কৃষি-পানি ধ্বংস করে কয়লাসম্পদ বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার অপচেষ্টায় এসব সংস্থা এখনো সক্রিয়; সেচ ও বন্যানিয়ন্ত্রণ প্রকল্প দিয়ে বহু অঞ্চল এখন জলাবদ্ধতার শিকার.. পাট খাত উন্নয়নের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পাট শিল্প বিপর্যস্ত; শিক্ষা ও চিকিৎসার খাতে নানা প্রকল্পের প্রভাবে এ খাতগুলো ছিন্ন ভিন্ন এবং ক্রমে জনগণের প্রবেশাধিকার সংকুচিত; সামষ্টিক অর্থনীতির নানা কর্মসূচির কারণে অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে আমদানিমুখী…। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ জিডিপি বহুগুণ বেড়েছে, কিন্তু এসব প্রকল্পের মধ্য দিয়ে মানুষের সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত হয়নি। এ প্রক্রিয়ায় চোরাই কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে আবার ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা চিকিৎসার নিরাপত্তার সুযোগ বিবেচনায় বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষই এখনো মানুষের জীবন লাভে সমর্থ হয়নি। অন্যদিকে শতকরা এক ভাগ দুর্বৃত্তের নিয়ন্ত্রণে ও আধিপত্যে এ দেশ জর্জরিত। …ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে দুর্নীতিবাজ স্বৈরশাসক এবং স্বাধীন চিন্তায় অক্ষম বা অনিচ্ছুক নীতিপ্রণেতাদের অস্তিত্ব ছাড়া এসব সংস্থার আধিপত্য কার্যকর হয় না।

Featured-1-1বৈশ্বিক ঋণ সংকটের বিরুদ্ধে র‌্যালি

এক বছরেরও বেশি সময় বিভিন্ন খাতের ওপর অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা শেষে ২০০৮ সালের ১ ডিসেম্বর মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীর নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল বসে। এর অন্য সদস্যরা ছিলেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সৈয়দ আবুল মকসুদ, সেলিনা হোসেন, অধ্যাপক আকমল হোসেন ও কামাল লোহানী। এ ট্রাইব্যুনালের সামনে কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পাট, ব্যাংক, জাতীয় সক্ষমতা ও জ্বালানি খাত নিয়ে তথ্য, যুক্তিসহ বিভিন্ন গবেষক দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য উপস্থিত করেন ডা. মুশতাক হোসেন, এমএম আকাশ, শাহ আলম, বজলুর রশিদ ফিরোজ, ড. মঈনুল ইসলাম ও আমি।

এর আগে ২৩ নভেম্বর ২০০৮ বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবি গণ-ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের কান্ট্রি ডিরেক্টর, আইএমএফ ঢাকা অফিসের রেসিডেন্স রিপ্রেজেনটেটিভ ও এডিবি ঢাকা অফিসের কান্ট্রি ডিরেক্টরকে এ মর্মে নোটিস দেয়া হয় যে ‘গণ-ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে তাতে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তারা বা তাদের প্রতিনিধিরা যেন উপস্থিত থাকেন। অন্যথায় একতরফা শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।’ বলাই বাহুল্য, তারা কেউ উপস্থিত হননি।

ট্রাইব্যুনালের সামনে এ সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে কয়েকটি অভিযোগ সুনির্দিষ্ট করা হয়েছিল নিম্নরূপে:

১. প্রতারণা। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলে বিভিন্ন প্রকল্প মহিমান্বিত করে কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্য প্রমাণিত হয় অর্থনীতির ওপর বিশ্ব পুঁজির দখল নিশ্চিত করা…

২. অস্বচ্ছতা, গোপনীয়তা।…এসব সংস্থা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা ক্রমাগত বললেও নিজেদের প্রকল্প কিংবা জ্বালানি, বিদ্যুৎ খাতসহ নানা ক্ষেত্রে স্বাক্ষরিত চুক্তি ও সমঝোতা গোপন রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়।

৩. ঘুস ও দুর্নীতি এবং দুর্নীতিবাজদের পৃষ্ঠপোষকতা। এসব প্রকল্প ও চুক্তির পক্ষে সরকারকে প্রভাবিত করবার জন্য আমলা, মন্ত্রী, বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের বিদেশ সফর, কনসালট্যান্সি, অবসর-পরবর্তী উচ্চবেতনে চাকরি ইত্যাদি বন্দোবস্ত রেখে ঘুস ও দুর্নীতির নতুন এক ব্যবস্থার বিকাশ ঘটায়।…

৪. চাপ, হস্তক্ষেপ ও লবিং। সব সাধারণ সম্পত্তি মুনাফামুখী তৎপরতায় দিয়ে দেয়া এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি, পরিবেশ দূষণ, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা বিনষ্ট করার মতো প্রকল্প গ্রহণের জন্য এসব সংস্থা হস্তক্ষেপ, ব্ল্যাকমেইল, চাপ ও লবিংয়ের নানা পথ অবলম্বন করে। চিংড়ি ঘের, বন, পানি প্রকল্প, বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ, পিএসআই চুক্তি ও ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বাস্তবায়নের অপচেষ্টা, তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের অবিরাম মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে স্থবিরতা তৈরি এসবের কিছু দৃষ্টান্ত।…

৫. জাতীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল, পঙ্গু বা বিলুপ্তকরণের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতার বিনাশ। আদমজী পাটকল, চট্টগ্রাম স্টিল মিল, রেলওয়ে, পাবলিক হাসপাতাল, বিএডিসি, পিডিবি, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, চট্টগ্রাম বন্দর ইত্যাদির দুর্বলতা বা বিলুপ্তি এসব সংস্থার বিভিন্ন প্রকল্পের ফলাফল।

৬. সংকটের অজুহাতে অধিকতর সংকট সৃষ্টি। বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং সে অজুহাতে সেসব সংস্থা বন্ধ করা বা বেসরকারীকরণ এদের বিভিন্ন প্রকল্পের লক্ষ্য হিসেবে প্রমাণিত।…

৭. জাতীয় অর্থনীতির পরিমাপযোগ্য ও অপরিমাপযোগ্য বিপুল ক্ষতিসাধন। এসব সংস্থার বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি খাতে বিপুল ব্যয়বৃদ্ধি, কৃষি ও শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদনশীলতা এবং কর্মসংস্থান হ্রাস, পরিবেশ দূষণ, প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, জাতীয় উদ্যোগ বিনষ্টকরণ, মেধাপাচার, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদিতে জনগণের প্রবেশাধিকার সংকোচন ও ব্যয়বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ অপরিমেয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। যুক্তিযুক্ত বেতন ও ন্যূনতম মজুরির বিরোধিতা করে জনগণের উৎপাদনশীলতা হ্রাস ও জীবন দুর্বিষহ করাতেও তাদের ভূমিকা প্রধান।

৮. অপরাধ করেও আইনের আওতামুক্ত থাকার অপচেষ্টা। বাংলাদেশের সম্পদ ও সম্ভাবনার বিপর্যয় সৃষ্টিতে সরকার ও সমর্থকদের সহযোগে এ সংস্থাগুলো প্রত্যক্ষভাবে দায়ী; তারা যে তাদের অপরাধ সম্পর্কে সচেতন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘দায়মুক্তি’ আইনের জন্য বিশ্বব্যাংকের অব্যাহত অপচেষ্টায়।…

এক বছরেরও বেশি সময় অনুসন্ধান এবং তার ওপর কয়েক ঘণ্টা শুনানির পর ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়,

এ ট্রাইব্যুনাল মনে করে যে এসব ধ্বংসাত্মক নীতি, প্রকল্প ও বেআইনি কার্যকলাপের ফলে বাংলাদেশের ব্যাপক আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতিসাধন হয়েছে। এ ট্রাইব্যুনাল এসব ক্ষতি ও অপরাধের জন্য বিশ্বব্যাংক ও তার সহযোগীদের সম্মিলিতভাবে দোষী সাব্যস্ত করছে। … একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির দ্বারা এ বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির সুষ্ঠু পরিমাপ করতে হবে এবং বিশ্বব্যাংক ও তার সহযোগীদের কাছ থেকে এসবের ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে।…

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

bankbimarkhobor.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

[abm_bangladesh_map]
advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক
মোঃ ইসলাম শেখ
কার্যালয়

৭৯, সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড, (৩য় তলা, বাম দিক), সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭

01760742336

bankbimarkhobor@gmail.com