| বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫ | প্রিন্ট | 137 বার পঠিত
ব্যাংক খাতে কার্যকর করপোরেট গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা চাই
গত ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের আগে ব্যাংক থেকে যেভাবে অর্থ লুটপাট, পাচার হচ্ছিল সে জায়গায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। অভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে কিছু ব্যাংককে দিচ্ছিল। আর সে টাকা বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছিল। এভাবে ৬০-৬৫ হাজার কোটি টাকা ছাপানো হয়েছিল। একটি গ্রুপ যা তাই করছিল। সেটি পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে এখন আর সে ধরনের টাকা বের হচ্ছে না। অভ্যুত্থানের পরে রেমিট্যান্স বেড়েছে, প্রতি মাসে গড়ে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আসছে। সর্বশেষ মার্চে এটি ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত কয়েক বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ছিল এক্সটার্নাল অ্যাকাউন্ট। ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি ও পাচার বন্ধ হওয়ায় এক্সটার্নাল অ্যাকাউন্টে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। ব্যালান্স অব পেমেন্টের পাশাপাশি কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ও ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে উন্নতি দেখা যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এসেছে। ব্যাংক খাত সংস্কারে বেশকিছু কমিটি গঠন হয়েছে। এরই মধ্যে বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাবও এসেছে। তবে সংস্কারের সুপারিশগুলো কতটুকু কাজ করবে সেটা এখনই বলতে পারছি না। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোকে একত্র করে দুটি ব্যাংক করার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সংস্কার ও শৃঙ্খলা আনার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান।
ব্যাংক খাতসহ দেশের সব ক্ষেত্রে লুণ্ঠন, মাফিয়াতন্ত্র, অনিয়ম-দুর্নীতি ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে যে জনআকাঙ্ক্ষা বা জনপ্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার কতটুকু পূরণ হয়েছে?
দেখুন, সময়ের কথা যদি বলি, অভ্যুত্থানের পর মাত্র সাত-আট মাস পার হয়েছে। জাতি হিসেবে আমরা অনেক বেশি আবেগপ্রবণ। সে কারণে গণ-অভ্যুত্থানের সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশাও অনেক। কিন্তু প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার বিষয়টিও মনে রাখতে হবে। আমরা অনেকে শ্রীলংকার সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করি। শ্রীলংকা মাত্র দুই বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে। তাহলে আমরা পারছি না কেন? আপনাদের দেখতে হবে, বাংলাদেশের তুলনায় শ্রীলংকার ব্যাংক খাত অনেক বেশি শক্তিশালী। তাদের ব্যাংক খাতে বড় কোনো লুণ্ঠন হয়নি। বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত হলো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত। আমরা এখন দেখছি, এখনই দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ২০ শতাংশ। আগামীতে এটি আরো বাড়তে পারে। অর্থনীতিকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড় করাতে হলে আগে ব্যাংক খাত ঠিক করতে হবে।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত পুরো বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ অনুপাত কমতে কমতে ৮ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। আবার সরকারের ঋণ-জিডিপির অনুপাত ৪০-৪৫ শতাংশ বলা হচ্ছে। কর থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে সরকার ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করতে পারছে না। এ কারণে সরকার ব্যাংক ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে। সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। এটি তো দীর্ঘমেয়াদে চলতে পারবে না। তবে জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকারের প্রচেষ্টা থাকতে হবে।
ব্যাংক খাতে এরই মধ্যে ২০ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। টাকার অংকে এর পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা। আপনার দৃষ্টিতে দেশের ব্যাংক খাত থেকে লুণ্ঠিত অর্থের পরিমাণ কত হতে পারে?
আমরা যে তথ্যগুলো বলছি, সেগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া। এখনো আমরা চূড়ান্তভাবে জানি না, ব্যাংক খাতের ক্ষতির পরিমাণ ঠিক কত। অনিয়ম-দুর্নীতি বেশি হওয়া ব্যাংকগুলোয় এখন ফরেনসিক অডিট হচ্ছে। অডিট প্রতিবেদন পাওয়ার পরই আমরা চূড়ান্তভাবে এ বিষয়ে কথা বলতে পারব। শ্বেতপত্র কমিটি বলেছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। গত ১৫ বছরে পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন সমীক্ষা ও গবেষণা করে আমরা এসব সংখ্যা বলছি। ব্যাংক খাত থেকে লুণ্ঠিত হওয়া সম্পদের পরিমাণও এখনো চূড়ান্ত নয়। আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা এর আগেও বলেছে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের ২৫ শতাংশ ঋণের মান ভালো নয়। এ ২৫ শতাংশের মধ্যে বেক্সিমকো, এস আলম নেই। আমরা শুনতে পাচ্ছি, এ দুই গ্রুপের ঋণের পরিমাণ আড়াই থেকে ৩ লাখ কোটি টাকা। বিদ্যমান খেলাপি ঋণের সঙ্গে বেক্সিমকো-এস আলমের ঋণ যুক্ত হলে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ ৪০ শতাংশও হয়ে যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত সংখ্যা পেতে আরো তিন-চার মাস সময় লাগবে।
ড. ইউনুসের সরকারের কাছে কেমন বাজেট চান?
সরকারের কাছে আমরা একটি যৌক্তিক বাজেট চাচ্ছি। ছোটবেলায় আমরা পড়েছি, ‘কাট ইউর কোট অ্যাকর্ডিং টু ক্লথ’। আয় বুঝে ব্যয় করাটি যেকোনো মানুষের জন্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি সরকারের জন্যও প্রযোজ্য। দেশের জন্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও প্রয়োজন। তবে অবশ্যই দেখতে হবে, কোন উন্নয়নগুলো আমাদের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। সেগুলোতে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে যেসব মেশিনারিজ দিয়ে এগুলো কার্যকর করা হবে, সেখানে সংস্কার দরকার। কারণ আগের মানুষরাই এখনো সব জায়গায় বসে আছে। যেকোনো কাজ যাতে স্বচ্ছতার সঙ্গে হয়, সরকারকে আগে সেটি নিশ্চিত করা দরকার।
সরকারকে আয় বাড়াতে মনোযোগী হতে হবে। তবে আয় বাড়াতে গিয়ে যাতে মানুষের কষ্ট না বাড়ে, সেটিও দেখতে হবে। মূল্যস্ফীতি উসকে ওঠে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া যাবে না। দেশে এখনো জ্বালানি সংকট আছে। অনেক কারখানা এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। এসব সংকটের সুরাহা করে সরকারকে আগে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে হবে। অন্যথায় বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আনা কষ্টকর হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বৃহৎ অংশ বেসরকারি খাতনির্ভর। কিন্তু আমরা দেখছি, এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে এসেছে। গত দুই দশকে এত বেশি ঋণ খরা দেখা যায়নি। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
এক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু দেখছি না। কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে আসছিল। মুদ্রানীতিতে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছিল, সেটি অর্জিত হচ্ছিল না। দেশে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি ৩০ শতাংশ কমে গেছে। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছে না। সবাই সরকারের পরবর্তী পদেক্ষপ ও নির্বাচনের দিকে নজর রাখছে।
ব্যাংক খাতের জন্য বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?
আমি ব্যাংক খাতে কার্যকর করপোরেট গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা চাই। এটা ছাড়া কোনো কিছু করা সম্ভব হবে না। আমি চাই, বাংলাদেশ ব্যাংক পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করুক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সঠিক পথে চলছে, ব্যাংকগুলো সঠিক পথে চলতে বাধ্য হবে।
ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আপনারা কী পরিকল্পনা করছেন?
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক সবসময় কমপ্লাইন্ট ব্যাংক। দেশের পটপরিবর্তনেও এ ব্যাংক অন্য অনেক ব্যাংকের তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে। এর মূল কারণ আমাদের করপোরেট সুশাসন। এ ব্যাংকের পর্ষদ থেকে শুরু করে সর্বস্তরে সুশাসন বিদ্যমান। আমরা কমপ্লাইন্ট উপায়ে ব্যবসাটা করার চেষ্টা করি, সেটির ধারাবাহিকতা আগামীতেও ধরে রাখতে চাই। আমরা মান উন্নত করে গ্রাহকদের দোরগোড়ায় সেবা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এবার আমরা একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্ট শুরু করার চিন্তা করছি। এ প্রজেক্টের আওতায় বিদেশে কীভাবে আরো দক্ষ জনবল পাঠানো যায়, সেটির উদ্যোগ নেয়া হবে।
Posted ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam