শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

৩ থেকে এখন ৬ শতাংশের কাছাকাছি ব্যাংক স্প্রেড

  |   সোমবার, ২৬ মে ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   118 বার পঠিত

৩ থেকে এখন ৬ শতাংশের কাছাকাছি ব্যাংক স্প্রেড

৩ থেকে এখন ৬ শতাংশের কাছাকাছি ব্যাংক স্প্রেড

সুদহার বাজারভিত্তিক করার পর থেকেই দেশে ব্যাংক খাতের স্প্রেড ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। দুই বছর আগে অর্থাৎ ২০২৩ সালের মার্চেও গড় স্প্রেড ছিল ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ধারাবাহিকভাবে বেড়ে এখন ৫ দশমিক ৮৭ শতাংশে ঠেকেছে। আর কিছু ব্যাংকের স্প্রেড ছুঁয়েছে ১০ শতাংশে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে তা ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে।

গ্রাহকদের জমা রাখা আমানত থেকে ঋণ বিতরণ করে ব্যাংক। আমানতের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে গ্রাহকদের সুদ পরিশোধ করা হয়, যা ব্যাংকের ‘কস্ট অব ফান্ড’ বা ‘তহবিল সংগ্রহ ব্যয়’ নামে পরিচিত। আবার ঋণের বিপরীতে গ্রাহকদের কাছ থেকে সুদ আদায় করা হয়। ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধানই হলো ‘স্প্রেড’। যে ব্যাংকের স্প্রেড যত বেশি, ওই ব্যাংকের মুনাফার সম্ভাবনাও তত বেশি। বর্তমানে ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের যে হারে সুদ দিচ্ছে, ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে নিচ্ছে তার চেয়েও অনেক বেশি হারে। ফলে আমানত ও ঋণের মধ্যকার সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেড ক্রমেই বাড়ছে। এতে ব্যাংক উপকৃত হলেও গ্রাহকরা বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের ব্যাংক খাতের বিদ্যমান গড় স্প্রেড গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ২০২০ সালের এপ্রিলে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশে বেঁধে দিয়েছিল সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরই স্প্রেড কমতে শুরু করে। ২০২০ সালের মার্চে ব্যাংক খাতের গড় স্প্রেড ছিল ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। সুদহার বেঁধে দেয়ায় পরের বছরের একই সময়ে এসে তা ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০২২ সালের মার্চে এসে গড় স্প্রেড দাঁড়ায় ৩ দশমিক ১০ শতাংশে। আর ২০২৩ সালের মার্চে আরো কমে ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান ২ দশমিক ৯৬ শতাংশে নেমে যায়।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঋণের সুদহারের সীমা তুলে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সুপারিশ আমলে নিয়ে ওই সময় সুদহার নির্ধারণে ‘মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল’ (স্মার্ট) চালু করা হয়। সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেয়ার প্রভাবে ওই বছর থেকেই ঋণের সুদহার বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বাড়তে শুরু করে স্প্রেডও। মাত্র এক বছরের মাথায় ২ দশমিক ৯৬ থেকে বেড়ে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান ৫ দশমিক ১৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। এরপর ২০২৪ সালের ৮ মে প্রজ্ঞাপন জারি করে সুদহার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সিদ্ধান্তের পর চলতি বছরের মার্চে এসে স্প্রেড ৫ দশমিক ৮৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দেড় দশকজুড়ে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে দেশের অন্তত দুই ডজন ব্যাংক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। দুর্বল হয়ে পড়া এ ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে ১২-১৪ শতাংশ সুদ প্রস্তাব করলেও গ্রাহকরা সাড়া দিচ্ছেন না। বরং ওই ব্যাংকগুলো থেকে আমানত তুলে নিয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যাংকে ৪-৬ শতাংশ সুদেও গ্রাহকরা টাকা জমা রাখছেন। এ কারণে দেশের ব্যাংক খাতের গড় স্প্রেডের পাশাপাশি কিছু ব্যাংকের স্প্রেড অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। এতে ভালো ব্যাংকগুলোর মুনাফায় উল্লম্ফন ঘটলেও দুর্বলগুলো লোকসানে পড়ছে। আর বাড়তি সুদের চাপে ভালো উদ্যোক্তারাও ব্যাংকে ঋণখেলাপি হয়ে যাচ্ছেন।

স্প্রেড অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে রয়েছে বলে জানান এর নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্প্রেড নিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। কোনো ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশের বেশি হলেই নোটিস করি। তার পরও আমরা দেখছি কিছু ব্যাংকের স্প্রেড বেড়ে যাচ্ছে।’

কিছু ব্যাংক সুনামের সুফল পাচ্ছে আর কিছু ব্যাংক ভাবমূর্তি সংকটের খেসারত দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন আরিফ হোসেন খান। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রাহকরা কিছু ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিয়ে অন্য ব্যাংকে রাখছেন। বেশি সুদ দেয়ার প্রস্তাব করা সত্ত্বেও গ্রাহকরা দুর্বল হয়ে যাওয়া ব্যাংকে আমানত রাখতে রাজি হচ্ছেন না। এক্ষেত্রে কম সুদ পেলেও তারা টাকা রাখছেন ভালো ব্যাংকে। আবার ভালো ব্যাংক থেকে বেশি সুদ হলেও ঋণ নিচ্ছেন গ্রাহকরা। এ কারণে বাজারে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। তার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক স্প্রেডের বিষয়টি নজরে রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিচ্ছে।’

দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের গড় সুদহারের ভিত্তিতে প্রতি মাসেই স্প্রেডের তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চে দেশের ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের গড় সুদহার ১২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ দেখানো হয়েছে। সে হিসাবে সুদের ব্যবধান বা স্প্রেড দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ স্প্রেড ছিল বিদেশী ব্যাংকগুলোর। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। আর বেসরকারি খাতের ৪২টি ব্যাংকের গড় স্প্রেড ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ ছিল।

দেশে কার্যরত বিদেশী ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমানত ও বিনিয়োগ রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। ব্যাংকটি ২০২৪ সালে রেকর্ড ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত মার্চে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আমানতের গড় সুদহার ছিল ১ শতাংশেরও কম, তথা দশমিক ৬৩ শতাংশ। যদিও একই সময়ে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের সুদহার ছিল ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ। সে হিসাবে বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশে। উচ্চ এ স্প্রেডের প্রভাবেই গত তিন বছর ব্যাংকটির মুনাফা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমনাতের গড় সুদহার সবচেয়ে কম ডাচ্-বাংলার, মাত্র ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। যদিও ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের সুদহার ১২ শতাংশের বেশি। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের স্প্রেড ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। আমানতের বিপরীতে গড়ে ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ মুনাফা (সুদ) দেয় শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক। এটি দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন গড় মুনাফা। এক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রাইম ব্যাংক (গড় সুদহার ৫ দশমিক ৪২ শতাংশ)। শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের স্প্রেড এখন যথাক্রমে ৭ দশমিক ১৪ ও ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া স্প্রেডের তথ্যে অবশ্য কিছুটা গরমিল রয়েছে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এমটিবির বিতরণকৃত ঋণের গড় ইল্ড এখন ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। আর কস্ট অব ডিপোজিট ৬ শতাংশের বেশি। সে হিসাবে আমাদের স্প্রেড ৩ শতাংশের আশপাশে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে তা ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ দেখাচ্ছে। আমার মনে হয়, স্প্রেড হিসাবায়নের ক্ষেত্রে কোনো ভুল হচ্ছে।’

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তারল্য সংকটের কারণে কয়েক বছর ধরেই ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার বাড়িয়েছে। মেয়াদি আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা এখন ১১ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ সুদ দিচ্ছি। আর ঋণ দিচ্ছি সাড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে। সে হিসাবে আমাদের ব্যাংকের মুনাফার মার্জিন খুবই কম। যদিও উজ্জ্বল ভাবমূর্তির ক্ষেত্রে এমটিবি সামনের সারিতেই রয়েছে। আর সংকটের এ সময়েও আমাদের রেকর্ড পরিমাণ আমানত বাড়ছে।’

গত দেড় দশকে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ এখন আর ফিরে আসছে না। আবার সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে খেলাপি ঋণও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বর শেষেই দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকায়। ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক ২০ শতাংশই খেলাপির খাতায় উঠেছে। তবে খেলাপি ঋণের এ হার ৩০ শতাংশেরও বেশি হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর একাধিকবার আভাস দিয়েছেন।

ব্যাংক ঋণের সুদহার ও স্প্রেড বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে দেশে সততার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগে আমরা ৭-৮ শতাংশ সুদেও ব্যাংক থেকে ঋণ পেয়েছি। কিন্তু এখন ১৪ শতাংশ সুদ দিয়েও ঋণ মিলছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের কিছু করারও নেই। বাড়তি সুদের চাপে ভালো ব্যবসায়ীরাও খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন।’

সুদহারের পাশাপাশি গত কয়েক বছরে ডলারের বিনিময় হারও অনেক বেড়ে গেছে। মীর নাসির হোসেন বলেন, ‘এ কারণে শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় ও মূল্য বাড়ছে। ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যবসায়ীদের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। বিপরীতে কারখানা সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। এভাবে চলতে পারে না। আমাদের কথাও কেউ শুনছে না।’

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২৬ মে ২০২৫

bankbimarkhobor.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

[abm_bangladesh_map]
advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক
মোঃ ইসলাম শেখ
কার্যালয়

৭৯, সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড, (৩য় তলা, বাম দিক), সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭

01760742336

bankbimarkhobor@gmail.com