| শনিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৫ | প্রিন্ট | 203 বার পঠিত
খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার ঠেকাতে সুশাসন ও সুনীতির চর্চা বাড়াতে হবে
বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক ও আর্থিক খাত ছিল সবচেয়ে ভুক্তভোগী। সুশাসন ও শৃঙ্খলার অভাব এতটাই যে স্বাধীনতার পর বিগত ৫৩ বছরে এ দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত এত বেশি সমস্যার মুখোমুখি আর কখনো হয়নি। নানা রকম অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। ঋণ জালিয়াতি, অবৈধ অর্থ পাচার থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারে কারসাজিসহ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতেই চলেছে দুর্বৃত্তপনা। তারল্য সংকটে পড়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত থেকে শুরু করে আধাসরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। খেলাপি ঋণের হার অসহনীয় মাত্রায় বেড়ে গেছে। সরকারি ঋণপ্রবাহ বেড়ে গিয়েছিল। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমায় বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। ব্যাংকের মাধ্যমে আসা বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ কমে গিয়েছিল এবং বৈদেশিক বাণিজ্য তথা আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে দেখা দিয়েছিল আস্থার সংকট। ভেঙে পড়েছিল পুরো আর্থিক খাত। অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিল। প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকীকরণ, সুশাসনের অভাব ও নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ায় সংকট তৈরি হয়েছিল ব্যাংক ও আর্থিক খাতে।
বিগত সময়ে সুশাসনের অভাবে এবং আইন না মেনে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশেষ গোষ্ঠীকে ঋণ সুবিধা দিয়ে ব্যাংকগুলোর সংকট ডেকে আনা হয়েছে। খেলাপি ঋণ বেড়েছে। বিগত সময়ে ব্যাংকের যে ভালো চর্চাগুলো ছিল, সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ গ্রহণ করে। শুধু কাগজে-কলমে আইন থাকলেই হবে না, আইনকে অনুসরণ করার মানসিকতা থাকতে হয়। আইনকে যথাযথভাবে অনুসরণ ও জবাবদিহি করার সংস্কৃতি থাকলেই সুশাসন নিশ্চিত করা যায়। এগুলো চর্চার বিষয়। এসব না থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠানই ভালো ফল দেয় না। তবে এর আগেও ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেগুলোর ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। বরং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইনের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে প্রভাবশালী ও ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সর্বেসর্বা হয়ে দুর্নীতি ও লুটপাট করেছে। ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে হলে রাজনৈতিক প্রভাববলয় থেকে ব্যাংক খাতকে মুক্ত রাখতে হবে। ব্যক্তিকে নয়, প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিয়ে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিতের পাশাপাশি নৈতিকতার চর্চাও করতে হবে। শীর্ষ পদগুলোয় দায়িত্বশীল, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তির পদায়নও জরুরি। এ খাতে এখন দরকার শৃঙ্খলা, সুশাসন, নিয়ন্ত্রণ ও পরিবীক্ষণ আরো সুদৃঢ় করা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক দখল করে নজিরবিহীন লুটপাট করা হয়েছে। লুটপাটের টাকার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে ওইসব ঋণ এখন আদায় হচ্ছে না। আদায় না হওয়ার কারণে ব্যাংক সেগুলোকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করছে। এতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের এ বৃদ্ধিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বর্তমানে ব্যাংক খাতের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধান করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে কিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়াসহ আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। ওই টাস্কফোর্স ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধার করতে কাজ করছে। গত বৃহস্পতিবার দেশের সার্বিক হালনাগাদ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বর শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ২০ দশমিক ২ শতাংশ। সেপ্টেম্বর শেষে ছিল ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৭ শতাংশ। জুনে ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ১২ শতাংশ। জুন থেকে ডিসেম্বর—এ ছয় মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। আমানতকারীদের অর্থই নামে-বেনামে ঋণ হিসেবে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন কোম্পানি ও গোষ্ঠীকে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও জড়িত। তাই আইনি শক্ত পদক্ষেপ নিয়ে আমানতকারীদের অর্থ উদ্ধারে গুরুত্ব দিতে হবে। খেলাপিদের ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। খেলাপি ঋণ উদ্ধারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত এখন কঠিন সময় পার করছে। দুর্বল ব্যাংকের তালিকায় থাকা ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও অন্তত পাঁচটি এখনো চরম সংকটে রয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। এতে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ্যে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সম্প্রতি জানিয়েছেন, দুটি ব্যাংক ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং তারা এখন নিজেরা টিকে থাকতে পারছে। তবে কিছু ব্যাংক এখনো গ্রাহকের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে সমস্যায় পড়ছে। কিন্তু দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি না হলে কিছু প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে।
দেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোর পরিচালনা ও অবসায়নের প্রক্রিয়া সহজ করতে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন একটি আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। সংসদ না থাকায় এটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হবে, যা আগামী জুলাইয়ের মধ্যে কার্যকর হতে পারে বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এরই মধ্যে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা নেই। নতুন অধ্যাদেশ কার্যকর হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো দুর্বল ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন’ কার্যকর হলে সংকটাপন্ন ব্যাংকের সম্পদ ও দায় হস্তান্তর, নতুন মালিকানা বা প্রশাসক নিয়োগ এবং প্রয়োজনে লিকুইডেশনের ব্যবস্থা রাখা হবে। ব্যাংকের মালিকদের অনিয়মের প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এ খাতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ভালো চর্চাগুলোকে পাশ কাটিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। এ সময় সুশাসনের প্রচণ্ড অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্তসহ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় এ সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সার্বিক সুশাসনের অভাবে ব্যাংক খাতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। যদি ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অনেক সমস্যা সহজেই সমাধান করা যাবে। ব্যাংকগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক গাইডলাইন আছে। যদিও এসব গাইডলাইন সময়ে সময়ে পরিমার্জন হয়েছে। যারা ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে মনোনীত হবেন, তাদের মূল কাজ হচ্ছে পলিসি বা নীতি প্রণয়ন করা। আর ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব হবে সেই নীতি অনুসরণ করে সঠিকভাবে ব্যাংক ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। ঋণদান থেকে শুরু করে এমন কোনো কার্যক্রম নেই, যেখানে প্রভাব বিস্তার করা হয়নি। সমস্যা শুরু হয় এখান থেকেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা বোর্ডে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মীসহ এমনসব ব্যক্তিকেও নিয়োগদান করা হয়, যাদের ব্যক্তিগত সততা ও ব্যাংক কার্যক্রম সম্পর্কিত জ্ঞানের বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড ও প্রশাসন যদি তাদের নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন থাকত, তাহলে সুশাসন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা অনেকটাই সহজ হয়ে যেত। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, অনুশীলনের চর্চা করতে হবে। খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচার ঠেকাতে আইন মান্য করার এবং সুশাসনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সহজ হবে।
শৃঙ্খলা ও সুশাসন ছাড়া ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার, আর্থিক সংস্থার ওপর মানুষের আস্থা নিম্নগামী হবে। দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সংকট সমাধানে শুধু নীতি প্রণয়ন নয়, এর যথাযথ বাস্তবায়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। কেননা শক্তিশালী ব্যাংক ব্যবস্থা স্থিতিশীল অর্থনীতির পরিচয় বহন করে। রুগ্ণ-দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থা রুগ্ণ-দুর্বল অর্থনীতির প্রমাণ দেয়। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ওপর গ্রাহকের আস্থা অটুট রাখাও অত্যন্ত জরুরি। কেননা আস্থা নষ্ট হলে কিংবা না থাকলে গোটা অর্থনীতিতে ও অন্যান্য ব্যবস্থায় ধস নামতে বাধ্য। তাই ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা ফেরাতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফেরানোর বিকল্প নেই।
Posted ৫:২৮ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৫
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam