শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

আল-আরাফাহ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হচ্ছে

  |   সোমবার, ০৪ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   44 বার পঠিত

আল-আরাফাহ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হচ্ছে

দেশের ব্যাংকিং অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রস্থলে উঠে এসেছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক ব্লক ট্রেড, বিতর্কিত মালিকানার সম্ভাব্য পুনরাগমন এবং বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাফাত উল্লাহসহ একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে ব্যাংকটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল ও উদ্বেগপূর্ণ পরিস্থিতি। একই সময়ে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে আমানত বৃদ্ধি পেলেও নতুন আইনগত পরিবর্তন গ্রাহকদের আস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

সম্প্রতি শেয়ারবাজারের ব্লক মার্কেটে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের বড় পরিমাণ শেয়ার হস্তান্তর বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বছরের শুরু থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে আট কোটি শেয়ার ব্লক ট্রেডে লেনদেন হয়েছে, যা মোট শেয়ারের একটি বড় অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প সময়ে এত বড় লেনদেন স্বাভাবিক বাজার আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং এটি পরিকল্পিত মালিকানা পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়।

লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সীমিত সংখ্যক বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। এতে ধারণা আরও জোরালো হয়েছে যে, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ধীরে ধীরে শেয়ার সংগ্রহ করে ভবিষ্যতে পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। শেয়ারবাজারের বিধি অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে হলে ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ বাধ্যতামূলক। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই এ ধরনের লেনদেন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকটির অতীত প্রেক্ষাপট এই আশঙ্কাকে আরও গভীর করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আগের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হয় এবং বিতর্কিত উদ্যোক্তাদের শেয়ার স্থগিত রাখা হয়। এরপর থেকে ব্যাংকটি শেয়ারধারী পরিচালক ছাড়াই পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে সম্প্রতি ‘ব্যাংক রেগুলেশন আইন, ২০২৬’-এর সংশোধনের মাধ্যমে নতুন একটি বিধান যুক্ত হয়েছে, যা সংকটাপন্ন ব্যাংকের সাবেক মালিকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই পরিবর্তনের পর থেকেই বাজারে আলোচনা শুরু হয়েছে—বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠীগুলো কি আবারও ব্যাংক খাতে নিজেদের অবস্থান ফিরে পেতে যাচ্ছে।

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ আরও গুরুত্ব পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত কার্যক্রমের মাধ্যমে। সংস্থাটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাফাত উল্লাহসহ শতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, অনিয়মিত নিয়োগ, সুদ মওকুফে অসঙ্গতি এবং ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে। এ সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ নথি ও তথ্য ইতোমধ্যে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে জানান, দুদকের তদন্ত নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে পারেন না; তবে প্রয়োজন হলে সব ধরনের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা হবে।

তদন্তের আওতায় রয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ, বোর্ডের সিদ্ধান্ত, ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ সংক্রান্ত তথ্য, সুদ মওকুফের তালিকা এবং স্পন্সরশিপ কার্যক্রমের নথি। বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে কর হিসেবে জমা দেওয়া অর্থের উৎস এবং বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের বৈধতা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

ব্যাংকটির মালিকানা ঘিরে চলমান এই টানাপোড়েনের মধ্যেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সামনে এসেছে। রাজধানীতে সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় ধরনের বিক্ষোভে শুধু চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি নয়, বরং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিও উত্থাপিত হয়েছে। এতে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই আন্দোলনের পেছনে সংগঠিত স্বার্থ কাজ করতে পারে।

অন্যদিকে, সামগ্রিকভাবে ইসলামি ব্যাংকগুলোর চিত্র কিছুটা ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, এসব ব্যাংকে আমানত ধীরে ধীরে বাড়ছে। এক মাসের ব্যবধানে কয়েক হাজার কোটি টাকা নতুন আমানত যুক্ত হয়েছে, যা গ্রাহক আস্থা ফিরে আসার ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই আস্থার মধ্যেও নতুন আইনি সংশোধন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সংশোধিত আইনের একটি ধারা অনুযায়ী, তুলনামূলক কম অর্থ পরিশোধ করে সাবেক মালিকরা পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ব্যাংক সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং অতীতে বিতর্কিত গোষ্ঠীগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, অতীতে যেসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তারা যদি আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে, তাহলে পুরো ব্যাংকিং খাত নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন সাধারণ আমানতকারীরা।

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতিকে দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন, অন্যদিকে দুর্নীতির তদন্ত এবং পাশাপাশি আইনি পরিবর্তনের প্রভাব—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

এ বিষয়ে মতামত জানতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০৪ মে ২০২৬

bankbimarkhobor.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

[abm_bangladesh_map]
advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক
মোঃ ইসলাম শেখ
কার্যালয়

৭৯, সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড, (৩য় তলা, বাম দিক), সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭

01760742336

bankbimarkhobor@gmail.com