| মঙ্গলবার, ১৮ মার্চ ২০২৫ | প্রিন্ট | 71 বার পঠিত
সাউথ বাংলা ব্যাংকে আবারো অস্থিরতা
বেসরকারি খাতের সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংকে আবারো অস্থিরতা। এর জেরে গত রোববার পদত্যাগ করেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হাবিবুর রহমান। তার আগে পদত্যাগ করেছিলেন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) মো. নুরুল আজিম। নতুন চেয়ারম্যান মোখলেসুর রহমানের অনৈতিক হস্তক্ষেপ, বেনামি ঋণ ও অনিয়ম-দুর্নীতির জেরে ব্যাংকটিতে এ অস্থিরতা চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই চতুর্থ প্রজন্মের এসবিএসি ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় চলছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। ফলে কোনো এমডিই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। তার আগেই বাধ্য হয়েছেন পদত্যাগ করতে। এ তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হলেন হাবিবুর রহমান। গত রোববার ব্যাংকটির পর্ষদ সভায় বাগ্বিতণ্ডার জেরে তিনি পদত্যাগ করেন বলে জানা যায়।
এসবিএসি ব্যাংকের সর্বশেষ পর্ষদ সভার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ‘ওয়ান স্টিচ লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানির জন্য ৫৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ঋণ প্রস্তাব পাস হয় গত রোববার। এ ঋণসহ বিভিন্ন বেনামি ঋণের বিষয়ে ব্যাংকটির পরিচালকদের একটি অংশ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান মোখলেসুর রহমান ঋণটি অনুমোদনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত ঋণ প্রস্তাবটি পাস হলে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে ব্যাংক ছেড়ে চলে যান এমডি হাবিবুর রহমান।
পদত্যাগের বিষয়ে যদিও হাবিবুর রহমানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার তার সেলফোন নম্বরে কল দিলেও তিনি সাড়া দেননি। এ বিষয়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে এমডি পদত্যাগ করেছেন। আমরা তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি। ব্যাংক পরিচালনায় ব্যর্থতার কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন।’ ব্যাংকের যাবতীয় রীতিনীতি মেনেই পর্ষদে ঋণ প্রস্তাব পাস হয়েছে বলেও জানান মোখলেসুর রহমান।
এসবিএসি ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত এক বছরে ব্যাংকটি সম্প্রসারণ না হয়ে উল্টো সংকুচিত হয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এর আমানত স্থিতি ছিল ৯ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে আমানতের এ স্থিতি ৯ হাজার ১৯১ কোটি টাকায় নেমে আসে। আমানতের মতো ব্যাংকটির ঋণ স্থিতিও এ সময়ে বাড়েনি। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এসবিএসি ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি ছিল ৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে তা ৮ হাজার ৬২৫ কোটি টাকায় নেমেছে।
২০২১ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এসবিএসি ব্যাংকের গত বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বার্ষিক প্রতিবেদনেও ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারল্য সংকটে থাকা চতুর্থ প্রজন্মের এ ব্যাংক এখন মেয়াদি আমানতের বিপরীতে ১২ শতাংশ সুদ দিচ্ছে।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান, অর্থাৎ গত ৫ আগস্টের পর এসবিএসি ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান আবু জাফর মোহাম্মদ শফিউদ্দিন শামীম দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির পর্ষদ সভায় মোখলেসুর রহমানকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
এসবিএসি ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মোখলেসুর রহমান চেয়ারম্যান হওয়ার পর পরই ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করতে উদ্যোগী হন। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চলতি বছরের শুরুতে এএমডি মো. নুরুল আজিমকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেন। আবার নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার পাশাপাশি নীতিমালা ভঙ্গ করে অন্য ব্যাংক থেকে কয়েকজনকে নিয়ে আসেন। তারাই এখন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। এমডি হিসেবে হাবিবুর রহমানেরও তেমন কোনো ক্ষমতা ছিল না।
ব্যাংকটির একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা অবশ্য বিপরীত তথ্যও দিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এসবিএসি ব্যাংকে “পঞ্চপাণ্ডব” নামের একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এ পাঁচজনই ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডিসহ নীতিনির্ধারকদের নিয়ন্ত্রণ করেন। কোনো চেয়ারম্যান কিংবা এমডিই এ পাণ্ডবদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।’
রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১৩ সালে একসঙ্গে নয়টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। শুরু থেকেই চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে পরিচিত এ ব্যাংকগুলো পরিচালনায় সুশাসনের তীব্র ঘাটতি ছিল। এ নয় ব্যাংকের মধ্যে পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স) কার্যক্রম শুরুর তিন বছরের মধ্যেই অনিয়ম-দুর্নীতির ভারে বিধ্বস্ত হয়েছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেয়ার পর এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেন। চতুর্থ প্রজন্মের নয় ব্যাংকের মধ্যে এখন কেবল মধুমতি, মিডল্যান্ড ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের পুরনো পর্ষদই রয়ে গেছে। তবে এ তিন ব্যাংকের পর্ষদও ভেঙে দেয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এসবিএসি ব্যাংকের একজন উদ্যোক্তা পরিচালক নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেন, ‘চেয়ারম্যান হওয়ার পর মোখলেসুর রহমান তার রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে ঋণ বিতরণ করছেন। যেসব ঋণ এরই মধ্যে বিতরণ হয়েছে, সেগুলো ফেরত আসার সম্ভাবনা খুবই কম। এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতি আরো নাজুক হবে। সুশাসন পরিস্থিতির উন্নয়নে ব্যাংকটির পর্ষদও ভেঙে দেয়া দরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে পর্ষদ গঠন করে দিলে তবেই ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।’
রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া এসবিএসি ব্যাংকের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন খুলনার লকপুর গ্রুপের কর্ণধার এসএম আমজাদ হোসেন। নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঋণ কেলেঙ্কারির পরও তিনি ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় নয় বছর সেই দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের তদন্তে আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে বেনামি ঋণ নিয়ে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ, কর ফাঁকিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ মেলে। তার পরও ক্ষমতার জোরে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ ধরে রেখেছিলেন তিনি।
এ অবস্থায় ২০২১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বণিক বার্তায় ‘সাউথ বাংলা ব্যাংকের চেয়ারম্যান এসএম আমজাদ হোসেন; অনিয়মের ধারাপাত’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হয়। এর একদিন পরই ব্যাংকটির পরিচালকদের সম্মিলিত অনাস্থার মুখে চেয়ারম্যান পদ থেকে আমজাদ হোসেন পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
Posted ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৮ মার্চ ২০২৫
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam