| শনিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৫ | প্রিন্ট | 100 বার পঠিত
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংক খাত
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিনের গঠনগত দুর্বলতা ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কারণে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, মূলধনের ঘাটতি ও অদক্ষতা এ খাতকে দুর্বল করেছে। ঋণ প্রদানে সুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এ খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বছরের পর বছর ধরে ব্যাংক নির্বাহীদের পারস্পরিক ঋণ আদান-প্রদান ব্যাংক খাতকে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক। গত বুধবার রাতে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শিরোনামে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। এতে আর্থিক খাতের এ ভঙ্গুরতা কাটিয়ে ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে ১০টি অগ্রাধিকার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এ খাতের ভঙ্গুরতা মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার চিহ্নিত করছে। এ চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ১০টি পরামর্শের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক খাতের নীতিকাঠামো উন্নত করা, আমানত ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী নীতিকাঠামো তৈরি, পূর্ণাঙ্গ দেউলিয়া আইন প্রণয়ন, ব্যাংকিং নীতি ও প্রবিধান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, জরুরি প্রয়োজনে তারল্য সহায়তা নীতি তৈরি, ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকিতে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চাগুলোর অনুশীলন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের আর্থিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হারের লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ৫ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থনৈতিক মন্থরতার এ পরিস্থিতি কভিড-১৯ মহামারীর পর টানা দুই বছর ধরে চলছে। রফতানি প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়া ও বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণেই এ ধীরগতি। অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যদিও সেবা ও কৃষি খাত বিগত বছরের মতো একই গতিতে বেড়েছে।
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরো কমে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগে বিপর্যয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধীরগতিতে পরিচালনা করেছে। এ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাধা, নীতি অনিশ্চয়তা এবং ঋণ ও উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি এ অর্থবছরের বাকি সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প খাতের উন্নয়নে বাধা হয়ে থাকবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ (গত ৩০ বছরে সর্বনিম্ন), সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ প্রবণতা আরো নিম্নমুখী থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে মূল্যস্ফীতি গড়ে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল। এ হার ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতির পথ বেছে নেয় এবং জুলাই ২০২৪ থেকে নীতি সুদহার ১৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করে। খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়ে। এ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল অর্থনৈতিক কার্যক্রম সত্ত্বেও কঠোর মুদ্রানীতি চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ব্যাংক খাত এখনো তারল্য সংকট ও উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করছে বলেও মন্তব্য করে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ২০ দশমিক ২ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। এপ্রিল থেকে ৯০ দিন অতিবাহিত ঋণকে খেলাপি হিসেবে গণ্য করার নতুন নিয়মের ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করছে বিশ্বব্যাংক।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বৃদ্ধির কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়, টাকার অবমূল্যায়ন এবং সরকার ও ব্যাংকের বিভিন্ন প্রণোদনার ফলে এ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। এতে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এ সময় এটি ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ছিল।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয় ধীরগতির ছিল। এ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে রাজস্ব সংগ্রহ আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এ হার বৈশ্বিকভাবে অন্যতম নিম্ন। রাজস্ব ঘাটতি সীমিত রাখতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্প অনুমোদন ও বরাদ্দে সতর্কতা অবলম্বন করছে। ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ২৪ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে সাম্প্রতিক বিঘ্ন এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রফতানি ও অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষের দিকে ঘটায় এ অর্থবছরে এর প্রভাব সীমিত হবে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রফতানি ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। যদিও নীতিগত অনিশ্চয়তা থাকার কারণে এর প্রকৃত পূর্বাভাস দেয়া কঠিন।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্ন, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের রফতানি ও প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় যথাক্রমে ১ দশমিক ৭ ও দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমাতে পারে। ফলে ওই অর্থবছরে রফতানি ও প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৪ দশমিক ২ ও ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে জ্বালানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দরপতনের কারণে আমদানি ব্যয় কমবে। এতে চলতি হিসাবের ঘাটতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব আংশিকভাবে কমতে পারে।
Posted ৫:২১ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৫
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam