শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য

  |   সোমবার, ১২ মে ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   65 বার পঠিত

শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য

শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ। প্রায় তিন বছর ধরে শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে দেশের বেসরকারি খাতের আরো দুটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ছিলেন তিনি। দেশের ব্যাংক খাতের নানা সংকট, সম্ভাবনা ও শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে

সূচনাকাল থেকে বাংলাদেশে ইসলামী ধারার ব্যাংকিং প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকলেও দুই-তিন বছর প্রতিকূলতা চলছে। এক্ষেত্রে শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের অবস্থা কী?

বাংলাদেশে অর্থনীতিতে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো একসময় খুব ভালো ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেটি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। আমরা দেখেছি, দেশের ১০টি ইসলামী ধারার ব্যাংকের মধ্যে ছয়টিই একজনের মালিকানায় চলে গিয়েছিল। শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণও তারা নিতে চেয়েছিল। তবে আমাদের ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দৃঢ়তার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। ব্যাংক বাঁচানোর জন্য পরিচালকরা সে সময় রাতারাতি অনেক শেয়ার কিনতে বাধ্য হয়েছেন। এ কারণে ব্যাংক পরিচালকদের হাতে এখন ৬০ শতাংশেরও বেশি শেয়ার রয়েছে। পরিচালকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণে ব্যাংকটির ওপর তারা কালো ছায়া বিস্তৃত করতে পারেনি।

ব্যালান্স শিটের আকারে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে শাহ্‌জালাল কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও আর্থিক সব সূচকে এ ব্যাংকের অবস্থা বেশ সুদৃঢ়। তিন বছর ধরে আমাদের ব্যাংক ইনস্টিটিউট অব কস্ট ম্যানেজমেন্ট অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি), ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি), ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি) ও সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টসের (সাফা) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে স্বর্ণপদক পেয়ে আসছে। এসব স্বীকৃতি আমাদের জন্য বড় অর্জন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘সাসটেইনেবিলিটি রেটিংয়ে’ও আমাদের ব্যাংক স্থান পেয়েছে। গ্রিন ফাইন্যান্সের দিক থেকে দেশের আটটি সেরা ব্যাংকের একটি শাহ্‌জালাল। এসব অর্জন আমাদের ব্যাংকের আর্থিক দৃঢ় ভিতেরই স্বীকৃতি।

শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের শক্তির জায়গা কোনটি?

আমাদের ব্যাংকের শক্তির জায়গা হচ্ছে তারল্য ও বৈদেশিক বাণিজ্য। দেশের শরিয়াহ্‌ভিত্তিক ব্যাংকসহ বেশির ভাগ ব্যাংক যখন তারল্য সংকটে ভুগছে, তখন শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের হাতে ৫ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। এ মুহূর্তে আমাদের ব্যাংকের আইডিআর (বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত) ৮০ শতাংশ। এ ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহ ব্যয় (কস্ট অব ফান্ড) হার ৪ শতাংশের নিচে। এটি পুরো ব্যাংক খাতের মধ্যেই শীর্ষের দিকে। আমি যতদূর জানি, কেবল একটি বেসরকারি ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড আমাদের চেয়ে কিছুটা কম। মেয়াদি আমানতের (এফডিআর) বিপরীতে দেশের অনেক বড় ব্যাংকও ১১ শতাংশ মুনাফা দিচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা মুনাফা দিচ্ছি ৮ শতাংশ হারে। এত কম মুনাফা দেয়ার পরও আমাদের আমানতের সংকট নেই। এটি সম্ভব হয়েছে শুধু ব্যাংকের সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে। ইসলামী ধারার ব্যাংক হিসেবে আমাদের শরিয়াহ্‌ভিত্তিক বিনিয়োগ করতে হয়। সরকারি বন্ড কেনার সুযোগ না থাকা ও বেসরকারি বিনিয়োগ চাহিদা না থাকায় সংগৃহীত আমানতও বিনিয়োগ করতে পারছি না। আমরা যদি অন্য ব্যাংকগুলোর মতো ১১ শতাংশ মুনাফা দিতাম, তাহলে ১০ হাজার কোটি টাকার আমানত সংগ্রহও কোনো ব্যাপার হতো না।

তারল্যের পাশাপাশি শাহ্‌জালালের বড় শক্তি হলো বৈদেশিক বাণিজ্য (ট্রেড ফাইন্যান্স)। এ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতি বছর ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় দেশে আসে। রফতানির ক্ষেত্রে দেশে আমাদের অবস্থান দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে থাকা ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান খুবই কম। প্রতি বছর আমরা প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করছি। দেশে আমরাই একমাত্র ব্যাংক, যাদের আমদানির চেয়েও রফতানি বেশি। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার অ্যাকাউন্টে সবসময় ৩০০-৪০০ মিলিয়ন ডলার পড়ে থাকে। অর্থাৎ, ব্যালান্স শিটের আকারে কিছুটা ছোট হলেও আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য খুবই শক্তিশালী।

ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুরক্ষাকবচ বেশ দুর্বল বলে অভিমত আছে। আপনিও তাই মনে করেন কি?

অবশ্যই। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো ইচ্ছামতো সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড কিনতে পারছে। কিন্তু শরিয়াহ্‌ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারি টুলসে বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুবই সীমিত। সরকার যদি ট্রেজারি বিল-বন্ডের মতো সুকুক ছাড়ত আমরা সেগুলো কিনতে পারতাম। দুই বছর ধরে দেশে বিল-বন্ডের সুদহার ১২-১৩ শতাংশ। কিন্তু সর্বশেষ সুকুকে মুনাফা ধরা হয়েছে মাত্র ৯ ও ১০ শতাংশ। যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহারই ১০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টিতে আমরা দুর্বল কয়েকটি ব্যাংককে ৪০০ কোটি টাকার তারল্য ধার দিয়েছি। কিন্তু মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও সে টাকা ফেরত আসছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি আমাদের কাছ থেকে নিয়ে ওই টাকা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দিত, তাহলে শরিয়াহ্‌ পদ্ধতির মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা তুলে সেখানে বিনিয়োগ করতে পারতাম।

মালয়েশিয়া গত বছর ট্রিলিয়ন ডলারের সুকুক ইস্যু করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে সুকুক ইস্যু হয়েছে মাত্র চারটি। সুকুকসহ ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্র বাড়িয়ে এসএলআরের ছাড় কমালেও ক্ষতি হতো না। ব্যাংকের সংগৃহীত বেশির ভাগ আমানতের মেয়াদ তিন-ছয় মাস। কিন্তু আমরা দেখছি, সরকার সাত-আট বছরের জন্য সুকুক ইস্যু করছে। এত কম মেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুকুকে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি সুকুক চালু করলে ইসলামী ধারার দুর্বল ব্যাংকগুলোও সুযোগ নিতে পারত।

গভর্নর একাধিকবার ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোকে একত্র করে দুটি শক্তিশালী ব্যাংক গড়ে তোলার কথা বলছেন। বিদ্যমান বাস্তবতায় এটি কতটুকু সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

গভর্নর স্যার এ কথাটা বলেছেন ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতা বাড়ানোর জন্য। কারণ আমাদের এখানে একটি ইসলামী ব্যাংক অনেক বড়, বাকিগুলো ছোট। আবার অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ইসলামী ধারার বেশির ভাগ ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়েছে। এজন্য গভর্নর দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে একটি শক্তিশালী ব্যাংক গড়ে তোলার কথা বলেছেন। তবে তিনি এটাও বলেছেন যে এ একীভূতকরণ জোর করে কারো ওপর চাপিয়ে দেয়া হবে না। শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক কারো সঙ্গে একীভূত হতে চায় না। আমরা আমাদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে থাকতে ও বড় হতে চাই। আবার অন্য কোনো ব্যাংককে টেনে তোলার সক্ষমতা বা ইচ্ছা কোনোটাই আমাদের নেই।

২০২৪ সালে শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের নিট মুনাফা কমেছে, সেটি কেন?

গত বছর আমরা রেকর্ড ১ হাজার ৬৭ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছিলাম। এটি শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। চলতি বছর থেকে খেলাপি ঋণের মেয়াদ গণনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ হবে। খেলাপি বিনিয়োগ বেড়ে গেলেও আমাদের ব্যাংক যাতে দুর্বল না হয়, সেজন্য আমরা ৩৭০ কোটি টাকা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করেছি। এ কারণে ব্যাংকের নিট মুনাফা কিছুটা কমেছে। আমরা চাইলে ৩৬ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারতাম। দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই আমরা সেটি করিনি। লভ্যাংশ ঘোষণার চেয়ে সঞ্চিতি সংরক্ষণে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেও (জানুয়ারি-মার্চ) আমরা প্রায় ১০০ কোটি টাকার সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেছি।

শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক দুই যুগ পূর্ণ করেছে। এ উপলক্ষে গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে কী বার্তা দিতে চান?

গ্রাহকদের আমরা বলতে চাই, শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের অন ব্যালান্সশিটের আকার খুব বেশি বড় না হলেও অফ ব্যালান্সশিটের আকার অনেক বড়। টাকা কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা, কোনোটিরই সংকট আমাদের নেই। বিগত সময়ে আমরা কোনো ক্ষেত্রেই সংকটে পড়িনি। ভবিষ্যতেও কোনো অসুবিধায় পড়তে হবে না। দেশের অন্য ইসলামী ব্যাংকগুলোয় এখন তারল্য সংকট চলছে। সে ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের চলতি মূলধন, লেনদেন কিংবা বৈদেশিক বাণিজ্যে যদি কোনো সমস্যা হয় আমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। শরিয়াহ্‌ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমরা নিজেদের উজ্জ্বল ভাবমূর্তির ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। প্রমাণ করতে চাই, দেশের ব্যাংক খাত থেকে ইসলামী ব্যাংকিং ধারা হারিয়ে যায়নি। আমরা এখনো সমানতালে সেবা দিতে সক্ষম। দেশের শরিয়াহ্‌ভিত্তিক ব্যাংকিং ধারায় শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে দিনদিন প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। আগামীতে এটি আরো এগিয়ে যাবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

 

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১২ মে ২০২৫

bankbimarkhobor.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

[abm_bangladesh_map]
advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক
মোঃ ইসলাম শেখ
কার্যালয়

৭৯, সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড, (৩য় তলা, বাম দিক), সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭

01760742336

bankbimarkhobor@gmail.com