শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

বিসিসিআই থেকে ইস্টার্ন ব্যাংক: যাদের হাত ধরে সফলতা

  |   বুধবার, ২১ মে ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   91 বার পঠিত

বিসিসিআই থেকে ইস্টার্ন ব্যাংক: যাদের হাত ধরে সফলতা

বিসিসিআই থেকে ইস্টার্ন ব্যাংক: যাদের হাত ধরে সফলতা

বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের অন্যতম সফল আজকের ইবিএল দু’এক দিনে গড়ে উঠেনি, এর পিছনে আছে অনেক বড় গল্প, যোগ্য নেতৃত্বের পরিকল্পনা ও দক্ষ জনসম্পদের শ্রম। ১৯৯২ সালে বন্ধ হওয়া বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিসিসিআই যখন ইবিএল-এ রূপান্তরিত হয়, তখন ব্যাংকের আমানত ছিল ২৪২ কোটি টাকা, ঋণ ছিল ২১ কোটি টাকা এবং পুঞ্জিভূত লোকসান ছিল ৩১৪ কোটি টাকা। ১৯৯২ সালে ৩১৪ কোটি টাকা অনেক টাকা কারণ সে সময় দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলো মাত্র ২০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল।

২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২৫ বছর দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাংক হওয়ার সুদীর্ঘ পথযাত্রায় প্রথম ৭ বছর এমডি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন কাজী মাহমুদ সাত্তার। পরবর্তী ১৮ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্তমান এমডি আলী রেজা ইফতেখার যা বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের একটি অনতিক্রম্য রেকর্ড এবং যা সহসা অতিক্রম্য নয়।

পরিচালনায় সুশাসন ও দক্ষ নেতৃত্ব
ইস্টার্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বরাবরই সুশাসন এবং পেশাদারিত্বে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আলী রেজা ইফতেখার ২০০৭ সাল থেকে এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “প্রথম থেকেই মানব সম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে ইবিএল-এর সফলতায়।”
পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদের ভূমিকা স্পষ্ট করে দেওয়ায় ব্যাংকটি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। শাখা বৃদ্ধির পরিবর্তে প্রযুক্তি ও প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সারা দেশে সেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান এমডি আলী রেজা ইফতেখার এর গৌরবময় সময়কাল ২০০৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ব্যাংকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুচক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ৩০০০ কোটি আমানত ২০২৪ সালে হয়েছে ৪৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা (প্রবৃদ্ধি ১৪২৩%), ২০০৭ সালের ঋণ, অগ্রিম ৩১০০ কোটি টাকা ২০২৪ সালে ৪১ হাজার কোটি টাকা (প্রবৃদ্ধি ১২২৭%), ২০০৭ সালের মোট সম্পদ ৪২০০ কোটি টাকা থেকে ২০২৪ সালে হয়েছে ৬১ হাজার ১০০ কোটি টাকা (প্রবৃদ্ধি ১৩৪৭%), আমদানি ২০০৭ সালে ছিল ৪৫০০ কোটি টাকা যা ২০২৪ সালে হয় ৩৬ হাজার কোটি টাকা (প্রবৃদ্ধি৭০০%), রপ্তানিতে ২০০৭ সালের ২৭০০ কোটি টাকা ২০২৪ সালে হয় ৩৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা (প্রবৃদ্ধি ১১৩০%), শেয়ার ইক্যুইটি ২০০৭ সালে ছিল ৩৭১ কোটি টাকা যা ২০২৪ সালে হয়েছে ৪৩০৬ কোটি টাকা (প্রবৃদ্ধি ১০৬১%), ২০০৭ সালে অপারেটিং প্রফিট ছিল ১৮৭ কোটি টাকা যা ২০২৪ সালে হয়েছে ১৫৯৪ কোটি টাকা (৭৫২%), করপূর্ব প্রফিট ২০০৭ সালে ছিল ১২৮ কোটি টাকা যা ২০২৪ সালে হয়েছে ১২৯৭ কোটি টাকা (প্রবৃদ্ধি ৯১৩%) এবং করপরবর্তী প্রফিট ২০০৭ সালে ছিল ৪২ কোটি টাকা যা ২০২৪ সালে হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা প্রবৃদ্ধি (১৬৮৬%)।
আর্থিক বিশ্লেষণ

ইবিএল’র ২০২৪ সালের বার্ষিক রিপোটের তথ্যাদি ও হিসাবসমুহ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে ৫,৭১৫ কোটি টাকা বা ১৬.২ %। এর বিপরীতে ইন্টারেস্ট আয়/প্রফিট বেড়েছে ১,২৭৩ কোটি টাকা বা ৪৮% যা ইতিবাচক।
২০২৪ সালে আমানত বেড়েছে ৯,১৫৯ কোটি টাকা বা ২৫.১%। এর বিপরীতে ইন্টারেস্ট ব্যয় /প্রফিট প্রদান বেড়েছে ১,০২৯ কোটি টাকা। এর ফলে নিট ইন্টারেস্ট ইনকাম ৮১৪ কোটি টাকা থেকে ২৪৪ কোটি টাকা বা ৩০% বেড়ে হয়েছে ১,০৫৮ কোটি টাকা।

২০২৪ সালের ইনভেস্টমেন্ট ইনকাম পর্যালোচনা করে দেখা যায় ইনভেস্টমেন্ট ৯,৪০২ কোটি টাকা থেকে ৪,৯০২ কোটি টাকা বা ৫২.২% বেড়ে হয়েছে ১৪,৩০৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট ৭,০৩৪ কোটি টাকা থেকে ৫,২৮১ কোটি টাকা বা ৭৫.১% বেড়ে হয়েছে ১২,৩১৫ কোটি টাকা। ইনভেস্টমেন্ট ইনকাম ৭৬৮ কোটি টাকা থেকে ২৪৯ কোটি টাকা বা ৩২.৪% বেড়ে হয়েছে ১,০১৭ কোটি টাকা যার মধ্যে গভর্নমেন্ট সিকিউরিটি ইনভেস্টমেন্ট ইনকাম ৩৯১ কোটি টাকা থেকে ৪২৩ কোটি টাকা বা ১১০.৫% বেড়ে হয়েছে ৮২৩ কোটি টাকা যা প্রশংসনীয়।

২০২৪ সালের বৈদেশিক বাণিজ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইমপোর্ট ২৬,৭৩২ কোটি টাকা থেকে ৯,৩৩৬ কোটি টাকা বা ৩৫% বেড়ে হয়েছে ৩৬,০৬৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে এক্সপোর্ট ২২,৭৯৭ কোটি টাকা থেকে ১০,৪৭৭ কোটি টাকা বা ৪৬% বেড়ে হয়েছে ৩৩,২৭৪ কোটি টাকা যা প্রশংসনীয়। এর ফলে কমিশন ও এক্সচেঞ্জ আয় ৪৪০ কোটি টাকা থেকে ১০৮ কোটি বা ২৪.৫% বেড়ে হয়েছে ৫৪৮ কোটি টাকা।

নিট ইন্টারেস্ট ইনকাম প্রবৃদ্ধি ২৪৪ কোটি টাকা ইনভেস্টমেন্ট ইনকাম প্রবৃদ্ধি ২৪৯ কোটি টাকা এবং কমিশন, এক্সচেঞ্জ ব্রোকারেজ প্রবৃদ্ধি ১০৮ কোটি টাকার উপর ভিত্তি করে অপারেটিং ইনকাম ২০৫২ কোটি টাকা থেকে ৬১০ কোটি টাকা বা ২৯.৭% বেড়ে হয়েছে ২৬৬২ কোটি টাকা যা ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়।

অপারেটিং ইনকাম ও এক্সপেন্স
অপারেটিং ইনকাম প্রবৃদ্ধি ৬১০ কোটি টাকা বা ২৯.৭% এর বিপরীতে অপারেটিং এক্সপেন্স প্রবৃদ্ধি ১৬১ কোটি টাকা বা ১৭.৭%। তুলনামূলকভাবে কম। যার মধ্যে জনসম্পদের বেতনভাতা বেড়েছে ১১৩ কোটি টাকা বা ২১.২%। বিগত ৬ বছরের জনসম্পদ ও তাদের বেতনভাতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৬ বছরে জনসম্পদ বেড়েছে ১,০২৯ জন বা ৫৪.৪%। অন্যদিকে ৬ বছরে বেতনভাতা বেড়েছে ২৬৯ কোটি টাকা বা ৭১.৯%। প্রতিবছর সরল গড়ে ১২%। তুলনামূলকভাবে বেতনভাতা প্রবৃদ্ধি দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুদক্ষ ও প্রফেশনাল জনসম্পদকে ধরে রাখার জন্যে এমন জনসম্পদ বান্ধব বেতনভাতা নীতি অপরিহার্য। ব্যবস্থপনা পরিচালক দক্ষ জনবল নিয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন যাতে ব্যাংকের স্থায়ী উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।

অপারেটিং ইনকাম প্রবৃদ্ধি ২৯.৭% এর বিপরীতে অপারেটিং এক্সপেন্স প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম ১৭.৭% হাওয়ায় প্রফিট বিফর প্রভিশন ১,১৪৫ কোটি টাকা থেকে ৪৪৯ কোটি টাকা বা ৩৯.২% বেড়ে হয়েছে ১,৫৯৪ কোটি টাকা। কস্ট ইনকাম রেশিও গত ৬ বছরে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন যা কনসিসটেন্স, ইতিবাচক ও প্রশংসিত।

তবে বিগত ৭ বছরের শ্রেণিকৃত ঋণ ও রিটেন অফ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৮ সালে শ্রেণিকৃত ঋণ ও রিটেনঅফ মিলে ১৮৩৯ কোটি টাকা, ২০১৯ সালে ২১২৩ কোটি টাকা, ২০২০ সালে ১৯৬৮ কোটি টাকা, ২০২১ সালে ২৩৫৭ কোটি টাকা, ২০২২ সালে ২৪৭০ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ২৭৫২ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে ৩৩৮৯ কোটি টাকা যা বিগত ৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্য। ৩৩৮৯ কোটি টাকা ঋণ ও অগ্রিম ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকার ৮.২৪%। এই টাকা আদায় ব্যাংকের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

অনন্য দৃষ্টান্ত
অধিকাংশ ব্যাংক যেখানে তারল্য সংকটে ভুগছে সেখানে ইবিএলের এর মূলধন সারপ্লাস রয়েছে ১৭৫০ কোটি টাকা। ইবিএলের মূলধন প্রয়োজন ৩ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা কিন্তু রয়েছে ৫ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা।

ইবিএল-এর গত ১০ বছরের মুনাফা ও লভ্যাংশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৫ সালে ২২২ কোটি টাকার মুনাফার বিপরীতে লভ্যাংশ ছিল ৩৫%, ২০১৬ সালে ২৬৬ কোটি টাকার মুনাফার বিপরীতে লভ্যাংশ ছিল ২৫%, ২০১৭ সালে ২৪০ কোটি টাকার মুনাফার বিপরীতে লভ্যাংশ ছিল ২০%, ২০১৮ সালে ৩০৮ কোটি টাকার মুনাফার বিপরীতে লভ্যাংশ ছিল ৩০%, ২০১৯ সালে ৪০১ কোটি টাকার মুনাফার বিপরীতে লভ্যাংশ ছিল ১৫%, ২০২০ সালে ৪১০ কোটি টাকার মুনাফার বিপরীতে লভ্যাংশ ছিল ৩৫%, ২০২১ সালে ৪৬৫ কোটি টাকার মুনাফার বিপরীতে লভ্যাংশ ছিল ২৫%, ২০২৩ সালে ৬১১ কোটি টাকার মুনাফার বিপরীতে লভ্যাংশ ছিল ২৫% এবং ২০২৪ সালে ৭৫০ কোটি টাকার মুনাফার বিপরীতে লভ্যাংশ ছিল ৩৫% যা ইবিএল-এর জন্য গৌরবের। ২০১৫ সালে ৬১১ কোটি টাকা পেইড আপ ক্যাপিটাল এ ৩৫% লভ্যাংশ ছিল ২১৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে ১,৩৫৮ কোটি টাকা পেইড আপ ক্যাপিটাল-এ ৩৫% লভ্যাংশ ৪৭৫ কোটি টাকা।

ইস্টার্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২০ বছর ধরে ৩ শতাংশের কাছে রয়েছে যা ভবিষ্যতের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক।
চলমান সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর জন্য ইস্টার্ন ব্যাংক একটি অনুকরণীয় মডেল হতে পারে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেন, “যদি বন্ধ হওয়া ব্যাংক পুনর্গঠন করে সফল করা যায়, তাহলে চালু থাকা ব্যাংকগুলোকেও উন্নত করা সম্ভব।”

ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরী বলেন, “পরিচালকরা কখনো ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেননি। এটি সুশাসন প্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠি। যখন পরিচালকেরা হস্তক্ষেপ করেন, তখনই ব্যাংক খারাপ অবস্থায় চলে যায়।”

বিসিসিআই থেকে ইস্টার্ন ব্যাংকে রূপান্তরের এই যাত্রা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। সুশাসন, প্রক্রিয়াভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে ইস্টার্ন ব্যাংক এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য এটি হতে পারে আদর্শ পুনর্গঠনের মডেল।

 

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:২২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২১ মে ২০২৫

bankbimarkhobor.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

[abm_bangladesh_map]
advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক
মোঃ ইসলাম শেখ
কার্যালয়

৭৯, সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড, (৩য় তলা, বাম দিক), সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭

01760742336

bankbimarkhobor@gmail.com