| রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | 205 বার পঠিত
নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক একসময় নতুনত্ব ও আধুনিক ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মের প্রতীক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। তৎকালীন উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম সদস্য আব্দুল আওয়াল মিন্টু, এ কে এম আবু তাহেরসহ একঝাঁক অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যাংকারের হাত ধরে আল্লাহর রহমতে ব্যাংকটির যাত্রা শুরু হয়।
দীর্ঘ পথচলায় ব্যাংকটি একাধিকবার গুরুতর সংকটের মুখে পড়ে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকটির শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, দক্ষ ও সুনামধন্য অনেক পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় একটি নির্দিষ্ট পরিবারের আধিপত্য বিস্তার ঘটে এবং অযোগ্য নিয়োগ, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম বাড়তে থাকে।
সাবেক ব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগ
ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে বড় ধরনের জালিয়াতি, অবৈধ নিয়োগ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কিছু সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা দেশ-বিদেশে ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দিয়েছেন। এমনকি বিদেশি সাবসিডিয়ারিতেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এ ৩ সাবেক এমডি বিশেষ করে মেহমুদ হোসেন, শেখ আক্তার হোসেনসহ তাদের সিন্ডিকেট খুব সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, তবে বর্তমান এমডির দক্ষ ব্যবস্থাপনায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ব্যাংকটি।
একজন সাবেক ডিএমডি তার ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, বিদেশি শাখা ও সাবসিডিয়ারিতে নিয়োগে অর্থ লেনদেন হয়েছে। গ্রিসসহ কয়েকটি দেশে প্রবাসীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বলেও জানা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে কিছু অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে—বিদেশি শাখায় একই কর্মকর্তার ১৫–২০ বছর অবস্থান, নিয়মিত অডিটে এসব অনিয়ম কীভাবে উপেক্ষিত থেকে গেল?
বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার উদ্যোগ
বর্তমানে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে বর্তমান চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জনাব আরিফ বিল্লাহ আদিল চৌধুরী-এর নেতৃত্বে ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আরিফ বিল্লাহ আদিল চৌধুরী একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংকার হিসেবে পরিচিত। অতীতে অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি একটি ব্যাংক থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন এবং নানা প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন এমডি পদে যোগদান করেন নাই। বর্তমান ব্যাংকটিকে তিনি একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
তিনি ইতিমধ্যে থানা ভিত্তিকভাবে দেশের প্রায় সব শাখা পরিদর্শন করেছেন এবং সরাসরি কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ঋণ পুনরুদ্ধার, গ্রাহকসেবা, ডিপোজিট এবং রেমিটেন্সের প্রতি যে গুরুত্ব দিয়েছেন, তাতে ব্যাংকের কার্যক্রম বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সিন্ডিকেট ও চ্যালেঞ্জ
তবে অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের ভেতরে এখনো একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ও এমডির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে হেড অফিস এবং শাখায় গ্রাহক হয়রানির অভিযোগও উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকটিকে টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হলে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, “দুষ্ট গোয়াল থেকে গোয়াল শূন্য থাকাই ভালো।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং যেসব সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাদের পুনরায় কোনো ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ না দেওয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন গবেষকের মতে, “যদি প্রমাণিত অনিয়মকারীরা বারবার শীর্ষ পদে ফিরে আসে, তাহলে দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কখনো সম্ভব হবে না।”
আশার আলো
সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার প্রচেষ্টায় ব্যাংকটি অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন গ্রাহক ও খাতসংশ্লিষ্টরা। তবে এর জন্য প্রয়োজন কঠোর সিদ্ধান্ত, নিরপেক্ষ সংস্কার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা।
Posted ১১:২০ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
bankbimarkhobor.com | Mr. Islam