বুধবার ১লা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

খেলাপি ঋণের পাহাড়, আদায় মাত্র ৩.৫৭ শতাংশ

  |   সোমবার, ২২ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   38 বার পঠিত

খেলাপি ঋণের পাহাড়, আদায় মাত্র ৩.৫৭ শতাংশ

দেশের ব্যাংকিং খাতে অনাদায়ী ঋণের (খেলাপি ঋণ) চাপ নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। বিপরীতে একই সময়ে খেলাপি ঋণ থেকে নগদ পুনরুদ্ধার হয়েছে মাত্র ২২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের তুলনায় মাত্র ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ফলে ঋণ পুনরুদ্ধার সক্ষমতার দুর্বলতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের স্থিতি ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে রূপ নিয়েছে। যদিও এক প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, তবে এর পেছনে মূলত পুনঃতফসিল, অবলোপন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সমন্বয়মূলক পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে; প্রকৃত নগদ আদায়ের অবদান তুলনামূলকভাবে সীমিত।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক

ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৫০ শতাংশ। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ব্যাংকের সম্মিলিত ঋণ পুনরুদ্ধার হার মাত্র ১ দশমিক ০৩ শতাংশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭০ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। অথচ পুনরুদ্ধার হার মাত্র ০.২৮ শতাংশ। বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ৮১১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ; আদায় হার মাত্র ০.৯০ শতাংশ।

অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৪৬ দশমিক ৬১ শতাংশ; পুনরুদ্ধার হার মাত্র ০.৫৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৯৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ; আদায় হার ১০.৬০ শতাংশ। রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৩ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ; পুনরুদ্ধার হার ২.৭৩ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২০ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ; আদায় হার ১.৭৮ শতাংশ।

বেসরকারি ব্যাংক খাতেও ঝুঁকি বাড়ছে

বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশও গভীর চাপের মুখে রয়েছে। ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৩৩.৭৫ শতাংশ। অথচ গড় আদায় হার মাত্র ৪.২৭ শতাংশ।

সম্প্রতি একীভূত হওয়া ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৬.২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৬.৪৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যেখানে আদায় হার মাত্র ০.১২ শতাংশ।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৫.৭০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৬.২৭ শতাংশে পৌঁছেছে; পুনরুদ্ধার হার মাত্র ০.০৩ শতাংশ। ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৬.৬৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৭.৬৪ শতাংশ হয়েছে; আদায় হার মাত্র ০.২০ শতাংশ।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৭ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩০ হাজার ৮৫২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৮০ শতাংশেরও বেশি খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে আদায় হার মাত্র ০.৪৭ শতাংশ।

আলোচিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৬ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা থেকে কমে ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকায় নেমে এলেও মোট ঋণের প্রায় ৪৯.৩৪ শতাংশ এখনও খেলাপি। তবে ১১.৮৪ শতাংশ আদায় হার প্রদর্শন করে ব্যাংকটি তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে।

অন্যদিকে পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৪.১৭ শতাংশ, আদায় হার ০.৬০ শতাংশ। এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৮৪.০৪ শতাংশ হলেও পুনরুদ্ধার হার মাত্র ০.২৬ শতাংশ। প্রিমিয়ার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪১.৬২ শতাংশ হলেও আদায় হার ১৬.৬২ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩২ হাজার ৪০ কোটি টাকা থেকে কমে ২২ হাজার ১৪৪ কোটি টাকায় এলেও আদায় হার মাত্র ০.৭৮ শতাংশ।

বিদেশি ব্যাংকগুলোর পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী

বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে কার্যরত ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৮টির খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে, যা তাদের শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ তদারকির প্রতিফলন।

ব্যতিক্রম কেবল ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, যার খেলাপি ঋণের হার ৯৯.৮৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ব্যাংকটির কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় বর্তমানে বিক্রয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অন্যদিকে উরি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪.৩৭ শতাংশ এবং আদায় হার ০.৪৬ শতাংশ।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থান

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৮.৯০ শতাংশ, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ১৯.৫৭ শতাংশ এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ১৫.৫৯ শতাংশ।

পুনঃতফসিলনির্ভর খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, খেলাপি ঋণ হ্রাসে প্রকৃত নগদ পুনরুদ্ধারের তুলনায় পুনঃতফসিলের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। এক প্রান্তিকে ব্যাংকিং খাতে মোট ১ লাখ ১১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। পাশাপাশি ৪৭ হাজার ৭১৩ কোটি টাকার ঋণ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও হিসাবগত সমন্বয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি দেখানো হয়েছে।

এর বিপরীতে নগদ আদায় হয়েছে মাত্র ২২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ হ্রাসের বড় অংশই এসেছে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও হিসাবগত সমন্বয়ের মাধ্যমে; প্রকৃত অর্থে ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত আসার মাধ্যমে নয়।

কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত

ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আর্থিক খাতের সুশাসন, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া, তদারকি ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে। ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা এবং বৃহৎ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাবে।

সামগ্রিকভাবে পরিসংখ্যান নির্দেশ করে যে, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আর কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক সমস্যা নয়; এটি এখন একটি গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে। আর এই সংকটের অভিঘাত ক্রমশ ব্যাংকিং ব্যবস্থা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

এই সংস্করণটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়, গবেষণা প্রতিবেদন, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বা নীতিনির্ধারণী প্রকাশনার উপযোগী করে আরও প্রফেশনাল ও প্রিমিয়াম শব্দচয়নে উপস্থাপন করা হয়েছে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

bankbimarkhobor.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

[abm_bangladesh_map]
advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক
মোঃ ইসলাম শেখ
কার্যালয়

৭৯, সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড, (৩য় তলা, বাম দিক), সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭

01760742336

bankbimarkhobor@gmail.com